দি লর্ড অফ দ্য রিংস- প্রিভিউ

পাঠকরা একটা বই পছন্দ করার আগে বইটা কিছুটা পড়ে দেখতে চায়। তাদের জন্য প্রথম অধ্যায় থেকে ৪০০০+ বেশি শব্দের প্রিভিউ।

অধ্যায় এক

বহুল প্রত্যাশিত উৎসব

মিস্টার বিলবো ব্যাগিন্স। ব্যাগএন্ডের অধিবাসী এই সম্মানিত হবিট মহাশয় যেইমাত্র ঘোষণা করলেন যে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তার একশ এগারোতম জন্মদিনটি খুব ধুমধাম করে উদযাপন করবেন, তখন থেকেই পুরো হবিটন এলাকায় একটা চাপা উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যেতে লাগল। দেখতে দেখতে সেই চাপা উৎসাহ-উদ্দীপনা একেবারে হইহই কাণ্ড রইরই ব্যাপারে রূপ নিল।

ব্যক্তি হিসেবে বিলবো একটু অদ্ভুত আর অনেক ধনী। ষাট বছর আগে হঠাৎ একদিন বলা নেই কওয়া নেই এক অভিযানে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। সবাই ভেবে নিয়েছিল আর ফিরবে না বখে যাওয়া ছেলেটা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ছেলেটা ফিরেও এসেছিল। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অঢেল ধন-সম্পদ। অন্তত হবিটনের সবার ধারণা সেরকমই।

সেই থেকে বিলবোকে নিয়ে এলাকার হবিটদের মধ্যে আগ্রহের কমতি নেই। তার ধনসম্পদের পরিমান নিয়ে রীতিমত কিংবদন্তী ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশের এলাকাতে। সবাই বলাবলি করে, বিলবোর বাড়িতে অনেক গুহা আর টানেল বানানো হয়েছে। সেসব গুহা আর টানেলে অভিযানের গুপ্তধন থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে বিলবো। 

এদিকে সেই অভিযান থেকে ফেরার পর বিলবোর বয়সও যেন বাড়তে ভুলে গেছে। পঞ্চাশ বছর বয়সেও যেমন ছিল, নিরানব্বই বছর বয়সেও একই রকম। ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। সঙ্গতকারণেই অনেকেরই নজরে আসল ব্যাপারটা। এটা নিয়েও স্থানীয় লোকজনের মাঝে কানাঘুষা অনেক। লোকে বলাবলি করত, “এসব মোটেও স্বাভাবিক না। ভূতুড়ে কান্ড। এসব আজব ব্যাপার স্যাপার খুব বড় বিপদ ডেকে আনবে।”

কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিপদ হয়নি। কেউ কেউ বাঁকা চোখে দেখলেও বেশিরভাগ লোকজন, সবকিছু মেনে নিয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়মিত যাতায়াত বিলবোর বাড়িতে, শুধু স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরা বাদে। আশেপাশের গরীব হবিটদের মধ্যেও বিলবোর জনপ্রিয়তা আর গ্রহযোগ্যতা দুটোই বেশ ভালো। নিজের প্রচুর অর্থসম্পদ থাকলেও, সেই সম্পদ ব্যয়ের ব্যাপারে বিলবো সবসময়ই বেশ মিতব্যয়ী। কিন্তু গরীব-দুঃখীদের দান করার ব্যাপারে সে খুবই দিলখোলা। ফলে ঈর্ষান্বিত লোক যেমন ছিল, শুভাকাক্সক্ষীও কম ছিল না। কিন্তু অনেক শুভাকাক্সক্ষী থাকলেও বন্ধু-বান্ধব বরাবরই কম ছিল বিলবোর, ছিল না বললেই চলে। শেষপর্যন্ত অবশ্য তার ভাতিজা-ভাতিজিরা বড় হতে শুরু করলে তাদের সাথে বেশ হৃদ্যতা লক্ষ্য করা গেল। ভাতিজা-ভাতিজি বলতে কাজিনদের ছেলেমেয়েরা আর কি। নিজের তো কোনো ভাই-বোন নেই বিলবোর। আর বিয়েও করেনি! চিরকুমার।

এই ভাতিজা-ভাতিজিদের মধ্যে বিলবোর সবচেয়ে প্রিয় ছিল ফ্রোডো ব্যাগিন্স। বিলবোর বয়স যখন নিরানব্বই তখন সে এই ফ্রোডোকে দত্তক নিল এবং তার সবকিছুর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করল। ফ্রোডোকে উত্তরাধিকারী হিসেবে নেয়ার ব্যাপারটা মোটেও ভালোভাবে নেয়নি স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরা। যাইহোক, দত্তক নেয়ার পর থেকেই বিলবোর সাথে ব্যাগএন্ডে থাকতে শুরু করল ফ্রোডো। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, বিলবো আর ফ্রোডোর জন্মদিন একই দিনে। ২২ সেপ্টেম্বর। একদিন ফ্রোডোকে ডেকে বিলবো বলল, “এখানেই থেকে যাও আমার সাথে, জন্মদিনের পার্টিগুলো একসাথে খুব ধুমধাম করে করা যাবে!” ফ্রোডোও ভালোবাসত বিলবোকে। রাজি হয়ে যেতে দেরি করেনি। তখন ফ্রোডোর বয়স ছিল বিশের কোটায়। হবিটদের রীতি অনুযায়ী, কুড়ির কোটার সময়টা হল শৈশব আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার মাঝামাঝি। তারা এই বয়সটাকে বলে ‘জ্ঞাকা-জ্ঞানহীন কুড়ি’। এই বয়সে নাকি কমবয়সী ছেলেপিলেরা নানা কা-জ্ঞনহীন কাজ-কারবার করে বেড়ায়। তারপর তেত্রিশ বছর বয়সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর থেকে কা-জ্ঞান ধীরে ধীরে ফিরে আসে। 

ফ্রোডোকে দত্তক নেয়ার পর বারো বছর কেটে গেল। প্রতিবছর একসাথে জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন চলতে থাকল। হবিটনের বাসিন্দাদের কাছে ব্যাপারটা একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হল। কিন্তু এবার ব্যাপার যে আরও অনেক বড় হবে সেটা অনেক আগে থেকেই আঁচ করতে পারছিল সবাই। অবশ্য আঁচ করতে পারা অস্বাভাবিক নয়। এবার জন্মদিনে বিলবোর বয়স হবে একশো এগারো, আর ফ্রোডোর হবে তেত্রিশ। একশো এগারো হবিটদের জন্য খুবই বিশেষ সংখ্যা। এই বয়সে পৌঁছালে হবিট-সমাজে তাকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হয়। এর আগে বিলবোর নানা মিস্টার ব্র্যান্ডোব্রাস টুক একশো ত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন। আর তেত্রিশ বছরে হবিটরা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছে বলে ধরা হয়। দুজনের জন্যই যখন স্পেশাল সংখ্যা তখন জন্মদিনের অনুষ্ঠান যে অনেক স্পেশালই হবে সেটা আঁচ করা তো কঠিন কিছু নয়।

সবমিলিয়ে পুরো হবিটনে খুব আলোচিত হয়ে উঠল এই পার্টি। বিলবোর অ্যাডভেঞ্চার, কাজকর্ম এখন পুরো এলাকায় আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। যেখানেই আড্ডা সেখানেই আড্ডার বিষয়বস্তু বিলবো।

তবে বিলবোকে নিয়ে গালগপ্পতে বুড়ো হ্যাম গ্যামজির জুড়ি মেলা ভার। এলাকার লোকজন তাকে গ্যাফার বলে ডাকে। তার ডাকনাম গ্যাফার হল কীভাবে সেটা স্পষ্ট নয়। চল্লিশ বছর ধরে বিলবোদের বাগানে মালির কাজ করছে হ্যাম গ্যামজি। এজন্য বিলবোকে নিয়ে তার গল্পের ঝুড়ি যে অন্যান্য সবার চেয়ে বড় হবে সেটাই স্বাভাবিক। হ্যামের আগে এই কাজ করত তার বাবা। এখন হ্যাম বুড়ো হয়ে গেছে। কাজকর্ম আগের মত আর করতে পারে না, তাই তার জায়গায় বিলবোদের বাগানের বেশিরভাগ কাজ করে হ্যাম গ্যামজির ছোট ছেলে স্যাম গ্যামজি। হ্যাম শুধু তদারকি করে। বিলবো এবং ফ্রোডো উভয়ের সাথেই এই দুই বাপ-ব্যাটার সম্পর্ক বেশ ভালো। আর এদের বাড়িও বিলবোর বাড়ির পাশেই।

“আমি তো সবসময়ই বলেছি, মিস্টার বিলবো খুব ভালো লোক। একেবারে নিপাট ভদ্রলোক যাকে বলে।” বলল গ্যাফার। কথা পুরোপুরি সত্য। বিলবো সবসময়ই খুব মূল্যায়ন করে তাকে। বাগানে সবজি বা গাছ লাগাতে হলে তার সাথে আলোচনা করেই তারপর সিদ্ধান্ত নেয়।

“কিন্তু বিলবোর সাথে যে ছেলেটা থাকে, ফ্রোডো, ওর ব্যাপারটা কী বল তো?” মজলিশি ঢং-এ জিজ্ঞাসা করল নোকস, “আমি শুনলাম, মায়ের দিক থেকে নাকি ছেলেটা ব্র্যান্ডিবাক? মানে ফ্রোডোর মা নাকি ব্র্যান্ডিবাক পরিবারের মেয়ে? কিন্তু আমি যেটা বুঝলাম না সেটা হল, ব্যাগিন্সদের মত পরিবারের ছেলে ওই বাকল্যান্ডের ব্র্যান্ডিবাক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে গেল কোন আক্কেলে।”

“আসলেই। আমারও ওই এক কথা!” পাশ থেকে যোগ করল ডাডি টুফুট, গ্যাফারের প্রতিবেশি।

“সে যাই হোক, মিস্টার ফ্রোডোও খুব ভালো ছেলে। বিলবোর মত। দেখতেও সুন্দর। মা যাই হোক বাবা তো ব্যাগিন্সই, তাই না? ফ্রোডোর বাবা মিস্টার ড্রোগো ব্যাগিন্সও বেশ ভালো লোক ছিলেন। অবশ্য অল্পবয়সে পানিতে ডুবে মরেছে লোকটা।” উত্তর দিল গ্যাফার।

“বল কী? তাই নাকি?” বেশ কয়েকজন একসাথে বলে উঠল। ওদের অবাক হওয়ার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল, ফ্রোডোর বাবার মৃত্যুর ব্যাপারে এতদিন অন্য কিছু জানত সম্ভবত। অন্যদের হাড়ির খবরের ব্যাপারে হবিটদের আগ্রহের অন্ত নেই। বরং এত বেশি আগ্রহ যে একই গল্প বারবার শুনতেও তাদের আপত্তি থাকে না সাধারণত। তাই আসল ঘটনার চেয়ে গুজবই বেশি ছড়ায়।

“আমি তো তা-ই জানি।” বলল গ্যাফার, “শোনো, মিস্টার ড্রোগো হল মিস্টার বিলবোর বাবার দিক থেকে দ্বিতীয় কাজিন। আর প্রিমুলা ব্রান্ডিবাক হল মিস্টার বিলবোর মায়ের দিক থেকে প্রথম কাজিন। এখন মিস্টার ড্রোগো বিয়ে করেছিলেন প্রিমুলা ব্র্যান্ডিবাককে। অর্থাৎ মিস্টার ফ্রোডোর সাথে মিস্টার বিলবোর সম্পর্কটা মার দিক থেকেও আছে, আবার বাবার দিক থেকেও আছে।”

একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল গ্যাফার, “বিয়ের পর মাঝে মাঝেই শ^শুরবাড়িতে যেতেন মিস্টার ড্রোগো ব্যাগিন্স। শ^শুরবাড়ির পাশেই ব্র্যান্ডিওয়াইন নদী (ব্র্যান্ডিওয়াইন নদীর আশেপাশের এলাকার নাম ব্র্যান্ডিল্যান্ড, আর এখান থেকেই ব্র্যান্ডিবাক নামটার উৎপত্তি)। ব্র্যান্ডিল্যান্ডের অন্যান্য লোকের মত, মাঝে মাঝে নৌকা নিয়ে নদীতে ঘুরতে যেতেন। একদিন বউকে নিয়ে এরকম ঘুরতে গিয়েছিলেন নদীতে। নৌকা ডুবে দুজনই মারা যান। মিস্টার ফ্রোডো তখন খুব ছোট। বেচারা ফ্রোডো!” ধীরে ধীরে দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে কথাগুলো বলল গ্যাফার।

“আমি তো জানতাম, একদিন ডিনারে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছিল ড্রোগো। সে রাতে নাকি সুন্দর জোছনাও ছিল। মনের সুখে নৌকা নিয়ে নদীতে হাওয়া খেতে গিয়েছিল ড্রোগো। ছোট্ট নৌকাটা নাকি ড্রোগোর ওজন না সইতে পেরে ডুবে গিয়েছিল!” উত্তেজিত গলায় বলল নোকস।

পাশ থেকে হবিটনের একমাত্র চালকলের মালিক স্যান্ডিম্যান আবার বলে উঠল, “আমি তো শুনেছি, ড্রোগোর বউ নাকি ড্রোগোকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল নৌকা থেকে। আর নিজে ডুবে যাওয়ার সময় বউকেও টেনে নিয়ে ডুবিয়েছে ড্রোগো!”

“যা শোনা যায় তার সব বিশ^াস করতে হয় না, স্যান্ডিম্যান! ধাক্কাধাক্কি বা টানাটানির কোনো ঘটনা ঘটেনি, এতটুকু অন্তত নিশ্চিত করতে পারি আমি।” গম্ভীর গলায় বলল গ্যাফার, “যাইহোক, মা-বাবার মৃত্যুর পর নানাবাড়িতেই অবহেলায় বেড়ে উঠছিল ফ্রোডো। সেখান থেকে তাকে এনে নিজের কাছে রেখে মিস্টার বিলবো খুব ভালো একটা কাজ করেছেন। অন্তত আমার তা-ই মনে হয়। ছেলেটা একটা ভালো ঘর পেল বেড়ে ওঠার জন্য!”

“তবে স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরা যে ফ্রোডোকে দত্তক নেয়ার ব্যাপারটা মোটেই ভালোভাবে নেয়নি সেটা তো বোঝাই যায়। মিস্টার বিলবো নিজে বিয়ে করেননি। ওরা ভেবেছিল তিনি মারা গেলে মিস্টার বিলবোর সুন্দর বাড়িটা ওদের দখলে যাবে। এইজন্য মিস্টার বিলবোর মরার অপেক্ষায় বসে ছিল। কিন্তু মিস্টার বিলবো তো বুড়ো হওয়ার নামই নিচ্ছিলেন না, এটা নিয়েই স্যাকভিল-ব্যাগিন্সদের দুঃখের সীমা ছিল না। তারমধ্যে ফ্রোডোকে এনে সবকিছুর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছেন মিস্টার বিলবো। এই জন্যই ফ্রোডোকে দুচোখে দেখতে পারে না ওরা।”

গল্পের এই পর্যায়ে ওয়েস্টফার্দলিং থেকে আসা একজন আগন্তুক বলল, “বাড়ির ভেতরে নাকি অনেকগুলো টানেল বানিয়েছেন মিস্টার বিলবো? আর সেসব টানেল নাকি সোনা-রূপা, মণি-মুক্তা আর নানারকম গুপ্তধনে ঠাসা?”

“আপনি একটু বেশি শুনেছেন! এরকম কোনো গুপ্তধন বা টানেলের কথা শুনিনি কখনও।” বিরক্ত হয়ে বলল গ্যাফার, “মিস্টার বিলবো এমনিতে খুব স্বচ্ছল। টাকা-পয়সার যে খুব একটা কমতি নেই সেটা তো চলাফেরাতেই বোঝা যায়। কিন্তু টানেল-ফানেল, গুপ্তধন-টুপ্তধন কিছু নেই। বছর ষাটেক আগে বিলবো যখন তার সেই বিখ্যাত অ্যাডভেঞ্চার থেকে ফিরেছিলেন, তখন তার সাথে কয়েকটা বড় ব্যাগ আর কয়েকটা সিন্দুক ছাড়া কিছু ছিল না। এসব কথা আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবে আমার ছোট ছেলে স্যাম। মিস্টার ফ্রোডোর সাথে খুব খাতির স্যামের। প্রায়ই বাড়িতে বসে একসাথে লম্বা সময় আড্ডা দেয় দুজন। মিস্টার বিলবোর অ্যাডভেঞ্চারের গল্পও সব জানে। গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে আমার স্যাম। ড্রাগন, এলফ, গুপ্তধনের সব গল্প ওর মুখস্ত। মিস্টার বিলবো ওকে কিছু লেখাপড়াও শিখিয়েছেন। আমি না করিনি ক্ষতি তো নেই।”

তারপর একটু থেমে ওকে বলে চলল গ্যাফার, “তবে আমি সবসময় স্যামকে ওসব ড্রাগন-এলফের গল্প নিয়ে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেছি। কিন্তু শোনে না কথা। কী লাভ ওসব জেনে? ওসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, বাগানের আলু-পটল নিয়ে মাথা ঘামালে বেশি কাজে দেবে! কিন্তু কথা শোনে না!”

মজলিশি ভঙ্গিতে মাঝারি ভাষণটা দিয়ে থামল গ্যাফার। কিন্তু তার শ্রোতারা তার ভাষণে খুব একটা প্রভাবিত হল বলে মনে হল না। মিস্টার বিলবোর গুপ্তধনের যে কিংবদন্তী বহুকাল ধরে শুনে আসছে, আজ হঠাৎ একজনের কথায় সেটা বাতিল করা সহজ নয়। আর গুপ্তধন থাক বা না থাক গুপ্তধনের গল্প তো আছে! এসব ছাড়া আড্ডা জমে?

“যত যা-ই বল, বিলবোর বাড়ি অদ্ভুত এক জায়গা। খুব সন্দেহজনক! কত অদ্ভুত সব লোকজনের আনাগোনা। গভীর রাতে বামনদের ঢুকতে দেখা যায় ওই বাড়িতে। আর ওই জাদুকর গ্যান্ডালফ তো প্রায়ই আসে।” বলল স্যান্ডম্যান।

প্রতিবারের মত এবারও হবিটনে হেমন্ত এলো প্রকৃতির সমস্ত স্নিগ্ধতা নিয়ে। সেপ্টেম্বর নাগাদ সেই স্নিগ্ধতা যেন আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। এই স্নিগ্ধতার মধ্যে একটা নতুন গুজব ছড়িয়ে পড়ল (সম্ভবত স্যাম গ্যামজির কল্যাণে)। এবার বিলবো আর ফ্রোডোর জন্মদিনে নাকি বিরাট আতশবাজির অনুষ্ঠান হবে। এমন আতশবাজি নাকি কোনোদিন দেখেনি এলাকাবাসী।

এভাবে নানান উৎসাহ-উদ্দীপনা, ঘটনা-রটনা আর গুজবে দিন যেতে লাগল। অনুষ্ঠানের দিন যতই কাছে আসতে লাগলো হবিটনেও বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়তে লাগল। বহিরাগতদের বেশিরভাগেরই গন্তব্য বিলবোর বাড়ি। তাদের কেউ ফিরে গেল, কেউ ব্যাগএন্ডে রয়ে গেল। বেশ কিছু অদ্ভুত-দর্শন গাধায় টানা গাড়িও এলো। গাড়িতে বোঝাই করে কী আনা হল সেটা বোঝা গেল না। গাড়ি এসে থামল বিলবোর বাড়ির সামনে তারপর মালামাল নামিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। এলাকার শান্তিপ্রিয় হবিটরা জানালার ফাঁক দিয়ে সব দেখল শুধু, কেউ কিছু বলল না।

অতপর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। ইস্ট-রোড ধরে আরেকটা গাড়ি আসছিল হবিটনের দিকে। গাধায় টানা নয়, ঘোড়ায় টানা গাড়ি। গাড়িটা ব্র্যান্ডিল্যান্ডের দিক থেকে বাইওয়াটার হয়ে ব্যাগএন্ডের দিকে এগোচ্ছিল।  গাড়িতে আরোহী শুধু একজন। এক বুড়ো। গায়ে বিরাট লম্বা একটা আলখাল্লা। মাথায় নীল রঙের লম্বা কোণাকৃতির টুপি আর কাঁধে রূপালী একটা স্কার্ফ। লম্বা একটা পাইপ টানতে টানতে মনের সুখে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে চলেছে বুড়ো। চেহারার অর্ধেক লম্বা দাড়িতে ঢাকা।

ছোট্ট ছেলেমেয়ের দল বেঁধে ছুটছে গাড়ির পেছনে। কারণ ওদের ধারণা এই গাড়িতেই আতশবাজি আছে। তাদের ধারণা সত্যি কারণ, আলখাল্লা পড়া এই বুড়ো আরোহীই বিখ্যাত জাদুকর গ্যান্ডালফ। আর এই হবিটনে লোকে তাকে মূলত চেনেই তার অসাধারণ আতশবাজির জন্য। কিন্তু গ্যান্ডালফের আসল কাজ যে এই আতশবাজির খেলা দেখানোর চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি গুরুতর এবং বিপজ্জনক, সেসব ব্যাপারে এই ছাপোষা হবিটদের জানার কথা নয়, আর জানেও না। তাদের কাছে গ্যান্ডালফ নিতান্তই ভীনদেশী এক জাদুকর যে নানান অনুষ্ঠানে আতশবাজির খেলা দেখিয়ে বেড়ায়। অবশ্য বিলবোর মত দুয়েকজন আসল ব্যাপার জানে।

বিলবো বাড়ির সামনে এসে গাড়ির মালপত্র নামাতে শুরু করল গ্যান্ডালফ। তাকে সাহায্য করছিল বিলবো আর কয়েকজন বামন। নানান রঙের, নানান সাইজের, অনেক অনেক আতশবাজি নামতে শুরু করল গাড়ি থেকে। বাচ্চারা এবার বুঝতে পারল, গুজবটা সত্যিই, এত বড় আতশবাজি সত্যিই কোনোদিন দেখেনি তারা। আতশবাজির এই বিরাট বহর দেখে বাচ্চারা হইচই করতে করতে এলাকা মাথায় তুলে ফেলল। ওদের আনন্দ দেখে গ্যান্ডালফেরও ভালো লাগল অনেক।

কিছুক্ষণ পর। বসার ঘরে পাশাপাশি বসে বিলবো আর গ্যান্ডালফ। বাইরে হেমন্তের বিকেলে নির্মলতা খেলা করছে। জানালা দিয়ে সেটাই উপভোগ করছিল দুই প্রবীণ বন্ধু।

বিলবোর বাগানটা সুন্দর। নানান রঙের ফুল ফুটেছে। প্রজাপতির দল খেলা করছে মনের সুখে। বাগানে সূর্যমুখী, স্ন্যাপ-ড্রাগন, গোলাপ সহ নানা প্রকার ফুল। সব ফুলের নাম হয়তো গ্যান্ডালফও জানে না। সূর্যমুখীগুলো মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল, যেন দেখতে চায় ভেতরে কী ষড়যন্ত্র করছে গ্যান্ডালফ আর বিলবো।

“তোমার বাগানটা খুব সুন্দর!” আস্তে আস্তে বলল গ্যান্ডালফ।

“হ্যাঁ, জানি আমি। আমারও খুব প্রিয়। সম্ভবত আমার এই বাগানটাই পুরো হবিটনে আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। এখান থেকে চলে গেলে বাগানটাকে মনে পড়বে খুব।” বলল বিলবো।

“তারমানে তুমি তোমার মত পাল্টাওনি! চলেই যাচ্ছ তাহলে?” বলল গ্যান্ডালফ।

“হ্যাঁ। যেতেই হবে। অনেক আগে থেকেই তো ভাবছি! এখানে সবই আছে কিন্তু কী যেন একটা…। আমাকে যেতেই হবে!”

“যদি ভালো হয় তাহলে যাও। সবাই সবার মত ভালো থাকুক!” বিলবোকে আশ্বস্ত করল গ্যান্ডালফ।

“তবে যাওয়ার আগে, হবিটনে এই শেষ জন্মদিনে প্রচুর আনন্দ করব!” উঠতি কিশোরের মত উচ্ছ্বসিত গলায় বলল বিলবো।

“দেখা যাক!” হালকা হেসে বলল গ্যান্ডালফ।

                                ***

পরের আরও কিছুদিন নানান রকম জিনিসপত্রে ঠাসা কার্ট আসলো ব্যাগএন্ডে। কার্টগুলোর বেশিরভাগই গাধা আর খচ্চরে টানা গাড়ি। ওই সপ্তাহেই খাবার-দাবার, বাসন-কোসন সহ অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর অর্ডার দেয়া শুরু হল। হবিটন, বাইওয়াটার সহ আশেপাশের সব এলাকার দোকানে দোকানে অর্ডার গেল। এত বিশাল সংখ্যক অর্ডার আর কখনও দেখেনি হবিটনের বাসিন্দারা। সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা খেলা করতে লাগল। সাগ্রহে দিন গুণতে লাগল ছেলে-বুড়ো সবাই।

কয়েকদিনে মধ্যে নিমন্ত্রণপত্রও দেয়া শুরু হল। নিমন্ত্রণপত্রের সংখ্যা এত বেশি যে পোস্ট-অফিসের কর্মকার্তা-কর্মচারীরা কাজের চাপে হিমশিম খেতে লাগল। প্রথমে হবিটনের পোস্ট-অফিস তারপর বাইওয়াটারের পোস্ট-অফিস ব্লকড হয়ে গেল। খন্ডকালীন পোস্টম্যান নিয়োগ দেয়া হল বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য। চিঠিপত্র যে হারে ব্যাগএন্ড থেকে যাচ্ছিল, সেই হারে ব্যাগএন্ডেও আসছিল। ব্যাগএন্ডে আসা বেশিরভাগ চিঠির ভাষ্য এরকম, ‘আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। আমরা সময়মত পৌঁছে যাব।’

গ্যান্ডালফ আসার পর থেকে বিলবোকে আর বাইরে দেখা গেল না তেমন। নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো, নানারকম প্রয়োজনীয় চিঠির উত্তর দেখা, গিফট প্যাক করা, নিজের অন্যান্য প্রস্তুতি, এসব নিয়ে খুবই ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা গেল তাকে। এমনকি অনেক আন্তরিকতার সাথে সবকিছু করা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত দরজার সামনে নোটিশ সেঁটে দিতে বাধ্য হল, ‘পার্টি ব্যতীত অন্য যেকোনো দরকারের জন্য পরবর্তীতে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা যাচ্ছে’।

একদিন সকালে হবিটনের বাসিন্দারা লক্ষ্য করল বিলবোর বাড়ির পাশের বিরাট খোলা মাঠটাতে অনেকগুলো বড় বড় খুঁটিঁ পোঁতা হয়েছে। দেখতে দেখতে সেসব খুঁটিতে বড় বড় তাবু আর প্যাভিলিয়ন টাঙানো হয়ে গেল। মাঠের বড় বড় গাছগুলোও বিরাট প্যাভিলিয়নের মধ্যে ঢাকা পড়ে গেল। সুন্দর সুন্দর লন্ঠন দিয়ে সাজানো হল গাছগুলোকে। রাস্তার পাশে বিরাট একটা সাদা গেট বানানো হল প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করার জন্য। এত বড় গেট হতে পারে সেটা প্রতিবেশিদের কল্পনাতেও ছিল না। পুরো কর্মযজ্ঞ দেখে সবার চোয়াল ঝুলে পড়ল রীতিমত।

রান্না-বান্নার জন্য বামনদের আগে থেকেই বলা ছিল। তারা কয়েকদিন আগেই ব্যাগএন্ডে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের আগে আগে স্থানীয় হোটেল আর সরাইখানার বাবুর্চিদেরও ডেকে পাঠানো হল, রান্না-বান্নার কাজে বামনদের সাহায্য করার জন্য।

অনুষ্ঠারের আগের দিন ছিল বুধবার। সেদিন হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। আকাশে দেখা যেতে লাগল মেঘের আনাগোনা। কিন্তু এলাকাবাসীর মনে মেঘ জমলো আরও বহুগুণ। শেষে উৎসব না আবার প- হয়ে যায়! কিন্তু বৃহস্পতিবারে অর্থাৎ ২২শে সেপ্টেম্বর সকল মেঘ কেটে যেতে লাগল। মেঘ সরিয়ে উঁকি দিল সকালের রোদ। উৎসব শুরু হয়ে গেল।

বিলবো অনুষ্ঠানটাকে ‘বার্থডে পার্টি’ বললেও সত্যি কথা বলতে যেন মেলা লেগে গেল। হবিটন এলাকার সবাইকে দাওয়াত তো দেয়া হয়েছিলই, ভুলবশত যারা বাদ পড়ে গিয়েছিল তারা দাওয়াত ছাড়াই চলে আসলো। মানে কেউ বাদ গেল না। হবিটনের বাইরে শায়ারের বিভিন্ন জায়গা থেকেও অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারাও পৌঁছে গেল সময়মত। এমনকি শায়ারের বাইরে থেকেও অনেক অতিথি আসলো।

বিলবো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেককে অভ্যর্থনা জানালো। সবাইকে গিফট দিল। ছোট-বড়, বাচ্চা-বুড়ো, কাছের-দূরের কাউকেই উপহারসামগ্রী দিতে বাদ রাখল না বিলবো।

এখানে বলে রাখা দরকার, হবিটদের মধ্যে একটা বিশেষ রেওয়াজ আছে। নিজের জন্মদিনে হবিটরা আমন্ত্রিত অতিথিদের নানারকম গিফট দেয়। আমরা জন্মদিনে গিফট পাই অতিথিদের কাছ থেকে, আর হবিটদের ক্ষেত্রে অতিথিরা গিফট পায় যার জন্মদিন তার কাছ থেকে। এলাকায় প্রতিদিন কারও না কারও জন্মদিন থাকে। তাই প্রত্যেক হবিট প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি হলেও গিফট পায়। এইসব জন্মদিনের গিফট সাধারণত ছোট্ট কিছু হয়। কিন্তু সেই ছোট্ট গিফটটা নিতেও হবিটদের মধ্যে আগ্রহের কমতি পড়ে না কখনও।

কিন্তু বিলবো আর ফ্রোডোর ওই জন্মদিনের গিফটগুলো মোটেও ছোট্ট কিছু ছিল না। সবাইকে স্পেশাল গিফট দেয়া হল। বিশেষ করে, বাচ্চারা তো তাদের গিফট পাওয়ার পর আনন্দে আত্মহারা। বাচ্চাদের বেশিরভাগকে নানারকম খেলনা দেয়া হল। এত সুন্দর খেলনা তারা এর আগে পাওয়া তো দূরের কথা, দেখেওনি। এসব খেলনার বেশিরভাগই কয়েকমাস আগে সুদূর ডেল মাউন্টেনের খেলনা-বিশেষজ্ঞ বামনদেরকে বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনানো। এসব খেলনা পেয়ে বাচ্চারা এত খুশি যে, কেউ কেউ তো খাওয়া-দাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে গেল।

মোটামুটি সব অতিথি পৌঁছে যাওয়ার পর প্যাভিলিয়নের নিচে উৎসব পূর্ণমাত্রায় শুরু হল। অনবরত নাচ, গান, বাজনা, নানারকম খেলা চলতে থাকল। আর সাথে অবাধ খাওয়া আর ড্রিংক তো থাকলই। এসব অবাধ খানা-পানির সাথে তিনবেলায় ছিল বিশেষ আয়োজন। দুপুরের খাবার, বিকেলের চা-নাস্তা, আর রাতের ডিনার।

সাধারণ খানা-পিনা তো সবসময়ই চলছিল, তারপরেও এই তিনবারের খাবারকে আলাদা করে বলার কারণ এই তিনবার সব অতিথিরা একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করেছিল। সকাল এগারোটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত চলল এই নাচ, গান, খাওয়া-দাওয়া। তারপর শুরু হল আতশবাজি। 

আতশবাজি পরিচালনা করলেন হবিটদের আতশবাজি বিশারদ গ্যান্ডালফ। শুধু আতাশবাজি অনুষ্ঠান পরিচালনা করাই নয়, এই সব আতশবাজির নকশা, পরিকল্পনা, উৎপাদন সব সবকিছুই নিজ হাতে করেছিল জাদুকর গ্যান্ডালফ। আর একেকটা আতশবাজি দেখার মত। আতশবাজির পাশাপাশি ছিল বিপুল পরিমানে ছোট ছোট ঝাড়বাতি, পটকা, মরিচবাতি, ছুঁচোবাতি। কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। আরও অনেককিছু যেগুলোর নাম হবিটরা শোনেওনি কখনও। যেমন বাহারি তাদের নাম, তেমন বাহারি দেখতে। ডর্ফ-ক্যান্ডেল, এলফ-ফাউন্টেন, গবলিন-বার্কার, থান্ডার-ক্ল্যাফ। প্রত্যেকটা একটা আরেকটার চেয়ে সেরা। সব দেখে সবচেয়ে গম্ভীর হবিটটিও শেষপর্যন্ত বলতে বাধ্য হল, ‘বয়সের সাথে গ্যান্ডালফের আতশবাজিরও উন্নতি হয়েছে’।

একটা হাউইবাজিতে আগুন দিতেই প্রথমে একটু উপরে উঠে গেল, তারপর সেটা ফেটে গিয়ে বেরিয়ে এলো একঝাক ঝলমলে পাখি। কিচির-মিচির করতে করতে কিছুক্ষণ উড়তে লাগল অতিথিদের মধ্যে। তারপর ঝলমল করে উঠে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল বাতাসে। আরেকটা হাউইবাজি থেকে বেরিয়ে এলো একটা জ্বলজ্বলে সবুজ গাছ, সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী দিয়ে গাছের কাণ্ড হল আর উপরে জ্বলজ্বলে সবুজ পাতা। চোখের সামনে সে পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে উঠল শত শত ফুল, তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে গাছ কান্ড পাতা ফুল সব মিলিয়ে গিয়ে ঝলমলে তারা হয়ে ঝরে পড়ল অতিথিদের উপর। আর তারা গুলো মিলিয়ে যাওয়ার সময় মিষ্টি একটা সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে গেল। আরেকটা হাউইবাজি হঠাৎ একটা ঝর্ণায় রূপ নিল, সেই ঝর্ণার চারপাশে শত শত প্রজাপতি। এছাড়া আরও ছিল উড়ন্ত ঈগল, পালতোলা জাহাজ, ডানা মেলা হংসমিথুন, নাচতে থাকা বজ্রঝড়, আরো যে কত কী বলে শেষ করা যাবে না।

কিন্তু একটা বিশেষ সারপ্রাইজ ছিল, বিশেষভাবে বিলবোর জন্য। আতশবাজিটা সাঁই করে বিরাট শব্দে উড়ে গেল দূরে, তারপর বিস্ফোরিত হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এক বিশাল পর্বত। সেই পর্বত থেকে উড়ে এলো একটা আস্ত ড্রাগন। সত্যিকারের ড্রাগনের মত সাইজে অতটা বিশাল না হলেও বেশ অনেকটা বড়, আর দেখতে আসল ড্রাগনের মতই ভয়ংকর। গর্জন করতে করতে সেই ড্রাগন ধেয়ে এলো বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়া অতিথিদের দিকে। ড্রাগনের মুখ থেকে অনবরত আগুন বের হচ্ছিল। পরিস্থিতির আতিশয্যে আর সামান্য অবিশ^াস মেশানো ভয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল অতিথিদের মাঝে। ড্রাগন অতিথিদের লক্ষ্য করে সবেগে নেমে আসতেই হতচকিত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া থেকেই উবু হয়ে বসে পড়ল। সে এক দেখার মত দৃশ্য। এ পড়ল ওর ওপর, ও পড়ল তার ওপর, বাচ্চা পড়ল বুড়োর উপর, বুড়ো পড়ল তরুণীর উপর। এরপর সবার মাথার উপরে পাক্কা তিনটা চক্কর দিল ড্রাগন। তারপর উড়ন্ত অবস্থাতেই আকাশে একটা ডিগবাজি দিয়ে আরেকটু সামনে উড়ে গিয়ে ঝিলমিল করতে করতে মিলিয়ে গেল।

এই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্পেশাল ডিনারের ডাক পড়ল। এই স্পেশাল ডিনারে গ্র্যান্ড প্যাভিলিওনের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট টেবিলে একসাথে বসল স্পেশাল গেস্টরা। স্পেশাল বলতে সংখ্যায় বারো ডজন, একশো চুয়াল্লিশ জন। (এই বারো ডজন সংখ্যাটাও হবিটদের জন্য বিশেষ অর্থ বহন করে। এই বারো ডজনকে হবিটরা বলো এক ‘গ্রোস’। আমাদের মত সাধারণ মানুষরা অবশ্য এই শব্দটার সাথে পরিচিত নন) এই স্পেশাল অতিথিদের বেশিরভাগই বিলবো আর ফ্রোডোর নিকট আত্মীয়। গ্যান্ডালফের মত অল্প কয়েকটা স্পেশাল কেস বাদে।

এই স্পেশাল টেবিলে যে সব হবিট পরিবারের প্রতিনিধিদের দেখা গেল, সেগুলো হল- ব্যাগিন্স, বফিন্স, ব্র্যান্ডিবাক, টুক, গ্রাব, চাব, বোলজার, গুডবডি, হর্নব্লোয়ার, প্রাউডফুট সহ আরও কিছু। স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরাও বাদ যায়নি এই স্পেশাল গেস্টদের তালিকা থেকে, যদিও এদের খুব একটা পছন্দ করে না বিলবো। পছন্দ না করার কারণ, ফ্রোডোকে ওরা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আর বিলবো ফ্রোডোকে ভালোবাসে বলে বিলবোকেও পছন্দ করতে পারে না ওই টিকোলো নাকের স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরা। অন্য কোনো সময় হলে হয়তো, নিমন্ত্রণপত্র পেয়েও আসত না স্যাকভিল-ব্যাগিন্সরা কিন্তু এবার নিমন্ত্রণপত্র এত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল যে না এসে পারেনি। শেষপর্যন্ত এসেছিলও, কিন্তু সেটা মেজবানকে সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়, কৌতূহল মেটানোর উদ্দেশ্যে।

একশো চুয়াল্লিশজন স্পেশাল অতিথির সবাই খুব করে খেল। খাওয়ার ব্যাপারে তাদের যতটা আগ্রহ খাওয়ার পর বিলবোর ভাষণে ততটাই অনাগ্রহ। খাওয়ার পর মেহমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবে মেজবান, এটাই হবিটদের চিরাচরিত নীতি। এই আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সাধারণত যা থাকে তা হল: নানানরকম সৌজন্যতামূলক কথাবার্তা, কবিতাপাঠ, অতীত-জীবনের গল্প, ইত্যাদি। তাই অতিথিদের মধ্যে অনুষ্ঠানের এই অংশটার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যায় কম। কিন্তু বিলবোর এত বিশাল প্রোগ্রামের পর কৃতজ্ঞতাস¦রূপ একটু ভাষণ শুনতে আপত্তি দেখালো না কেউই।

খাওয়ার পর বক্তৃতার সময় এলো। পছন্দের পানীয়ের মগ হাতে নিয়ে শোনার প্রস্তুতি নিল সবাই। সাথে সাথে নিজেরদের মধ্যে গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর চলছিল। সবাই এত উৎসবের আমেজে ছিল যে বিলবো যা বলবে তাতেই হইহই করে সমর্থন দেবে, সেটা পরিস্থিতি দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল।

“মাই ডিয়ার পিপল!” বলতে শুরু করল বিলবো। বিলবোকে শুরু করতে দেখে অতিথিদের মধ্যে রোল উঠল, “এই সবাই থামো! সবাই থামো! শোনো! শোনো!”

কিন্তু সবাইকে থামাতে বেশ সময় লাগল। সবার কোলাহল একটু থেমে আসলে, লন্ঠন দিয়ে সুন্দর করে সাজানো গাছটার সামনে একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে বিলবো বলতে শুরু করল, “আমার প্রিয় ব্যাগিন্স, বফিন্স, ব্র্যান্ডিবাক, টুক, গ্রাব, চাব, বলজার, গুডবডি, হর্নব্লোয়ার, প্রাউডফুট!”

“প্রাউডফুট না, প্রাউডফিট।” টেবিলের পেছন থেকে এক বুড়ো হবিট বলে উঠল।

“আচ্ছা প্রাউডফিট! আজ আমার একশো এগারোতম জন্মদিন!”  শেষের কথাটা একটু জোরে বলতেই অতিথিরা সবাই হইহই করে অভিনন্দন জানাতে শুরু করল একসাথে। হ্যাপি বার্থডে! হ্যাপি বার্থডে! হুররেহ! হুররেহ! আওয়াজ উঠল সজোরে।

চেঁচামেচিঁ একটু থিতিয়ে আসতেই বিলবো আবার বলতে শুরু করল, “আশা করি আজকের এই পার্টি সবার ভালো লেগেছে। আমার মতই এনজয় করেছেন সবাই!” বলতেই সবাই আবার “হ্যাঁ! হ্যাঁ!” করে উঠল কেউ কেউ আবার ‘না! না!’ বলতেও ছাড়ল না। এই হ্যাঁ আর না-এর মাঝে আবার শুরু হল গুঞ্জন। এবার গুঞ্জন আর থামছেই না।

কিন্তু বিলবোর কথা এখনও শেষ হয়নি। সবাইকে থামানোর জন্য পাশ থেকে একটা বাচ্চার বাঁশি নিয়ে তিনবার পিপ পিপ শব্দ করল বিলবো। এবার পিপ পিপ শুনে আবার সবার মনোযোগ ফিরল বিলবোর দিকে। বিলবো আবার বলতে শুরু করল, “আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না। কয়েকটা জরুরী কথা জানিয়েই শেষ করব।

“তিনটা আসল কথা বলেই শেষ করছি। প্রথমটা হল, আমি আপনাদের সবাইকে পছন্দ করি। এত অসাধারণ হবিটদের সাথে একশো এগার বছরের মত লম্বা সময়ও অনেক কম!” কথা শেষ হতেই হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল সবাই।

“এটা ছিল আনুষ্ঠানিক কথা, কিন্তু সত্যি কথা বলতে, আমি আপনাদের অর্ধেককে চিনি না। আর যে অর্ধেককে চিনি তার অর্ধেককে পছন্দ করি না। আর যে অর্ধেককে পছন্দ করি তাদের অর্ধেকের মধ্যে পছন্দ করার মত তেমন কোনো যোগ্যতা নেই। না থাকলেও পছন্দ করি বলতে হচ্ছে।” হর্ষধ্বনি একটু থেমে আসতেই মনের কথাটা ঝেড়ে দিল বিলবো। কিন্তু একথা শোনার পর শ্রোতারা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল, সমর্থন দেয়া উচিত নাকি বিরোধিতা করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিল না।

কিন্তু তাদের আর বেশি ভাবার সুযোগ না দিয়ে বিলবো আবার বলতে শুরু করল, “আজ আমার জন্মদিন। আমার মানে আমাদের। আমার আর আমার ভাতিজা ফ্রোডোর। আপনারা এরমধ্যেই হয়তো জেনে গেছেন, ও আমার সবকিছুর উত্তরাধিকারী। আজ ওর বয়স তেত্রিশ পূর্ণ হল। আজ থেকে আমার স্থাবর-অস্থাবর সবকিছুর মালিক হবে সে!” আবার আনন্দধ্বনি শোনা গেল অতিথিদের মাঝে। কেউ কেউ ‘ফ্রোডো! ফ্রোডো!’ রব তুলল। শুধু স্যাকভিল-ব্যাগিন্সদের খুব অসন্তুষ্ট মনে হল।

“আজ আমার একশো এগারো আর ফ্রোডোর তেত্রিশ। দুজনে মিলে আমরা একশো চুয়াল্লিশ। এজন্য আজ আমাদের স্পেশাল গেস্টের সংখ্যাও একশো চুয়াল্লিশ রাখা হয়েছে!” বলতে থাকলো বিলবো, “অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমার অ্যাডভেঞ্চারের কথা। বহুবছর আগে আজকের এই দিনে লং লেকে পৌঁছেছিলাম আমি। একটা ব্যারেরের ভেতরে ঢুকে। (দি হবিট দ্রষ্টব্য) কী সুন্দর দিন ছিল! অবশ্য সেদিন উত্তেজনায় নিজের জন্মদিনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম আমি!” অতিথিরা সব চুপচাপ শুনছিল। সবার মনে ভয়, এই বোধহয় লম্বা কাহিনী বলতে শুরু করবে বুড়ো বিলবো।

কিন্তু সেরকম কিছু হল না। একটু থেমে, যেন সামলে নিল নিজেকে, বলল, “আর তৃতীয়ত, একটা বিশেষ ঘোষণা। যদিও আমি বলেছি এই একশো এগারো বছর আপনাদের সাথে থাকার পক্ষে অনেক কম। কিন্তু আমি আসলে আর থাকতে চাইছি না। এখানেই শেষ আপনাদের সাথে আমার পথ চলা। আমি যাচ্ছি। বিদায়!”

বলেই চেয়ার থেকে নামল। আর মাটিতে নামতেই, ধূপ! সবার চোখের সামনে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল বিলবো ব্যাগিন্স। তাকে আর আশেপাশে কোথাও দেখা গেল না। অতিথিরা চোখের সামনে এই কা- দেখে হতভম্ব। বসে থাকা হবিটরা লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য পুরো প্যাভিলিয়নে পিনপতন নীরবতা। তারপর সবাই একসাথে কথা বলতে শুরু করল।

এবং কিছুক্ষণের মাঝেই বুড়ো হবিটরা সবাই একমত হল যে, বিলবোর শেষ রসিকতাটা মোটেও ভালো ছিল না। ভেরি ব্যাড জোক!  

বিলবোর শেষ বাজে রসিকতার খেসারত হিসেবে সবাই আবার গলা পর্যন্ত ড্রিংক নিল। সাথে চলল, বিলবোর উদ্ভট কাজ-কারবারের গল্প। এবং তাদের হইহল্লা থেকে যেটা বোঝা গেল সেটা হল, সবাই আগে থেকেই জানত এ বুড়ো একটা পাগল। আর তখন সবার সামনে ওর অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা নিতান্তই পাগলের মশকরা আর বুড়ো বয়সের ভীমরতী ছাড়া কিছুই নয়।

শুধু বুড়ো রোরি ব্র্যান্ডিবাক সবার মত আবোল-তাবোল কথা-বার্তায় অংশ নিল না। পাশে দাঁড়ানো ছেলের বউকে ধীরে ধীরে বলল, “বিলবোর আচরণ খুব রহস্যময়! নিশ্চয়ই আবার কোন নতুন পাগলামিতে পেয়েছে। ব্যাটা বোকা বুড়ো। অবশ্য চিন্তুা কী ফ্রোডো তো এখানেই থাকছে! ফ্রোডোই দেখেশুনে রাখবে!” তারপর অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্রোডোকে আরও ড্রিংক পাঠাতে বলে নিজের হাতের মগের দিকে মন দিল।

পুরো জমায়েতে একমাত্র ফ্রোডো কোনো কথা বলল না। যদিও পুরো সময়টা উপভোগ করছিল, কিন্তু সবার এই উল্টো-পাল্টা কথাবার্তায় যোগ দিতে ইচ্ছে করছিল না। বিলবোর অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটাও উপভোগ করেছিল সে। কিন্তু সবার চিৎকার-চেঁচামেচির মাঝে অনুভব করল বুড়ো বিলবোকে আসলেই ভালোবাসত সে। বিলবোর ব্যাপারে খারাপ কিছু বললে ভালো লাগে না ওর। নিজেরও আর পার্টিতে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। নিঃশব্দে হাতের মগের ড্রিংকটুকু শেষ করল। কিন্তু অতিথিরা তখনও খোশগল্পে মশগুল। সবাইকে আবার যথেষ্ট ড্রিংক সার্ফ করার ফরমায়েশ দিয়ে সবার অগোচরে সেও প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে গেল।

***

বইটি নিয়ে সম্ভাব্য সবকিছু একসাথে পেতে ক্লিক করুন: দি লর্ড অফ দ্য রিংস-বই পরিচিতি

Author: Moheul I Mithu

মহিউল ইসলাম মিঠু কৌতুহলী মানুষ। জানতে ভালোবাসেন। এজন্যই সম্ভবত খুব অল্প বয়সেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পড়ার অভ্যাসটাই হয়তো ধীরে ধীরে লেখার দিকে ধাবিত করেছিল। তার পাঠকপ্রিয় অনুবাদ গুলোর মধ্যে রয়েছে: দি হবিট, দি লর্ড অফ দ্য রিংস, পার্সি জ্যাকসন, হার্ড চয়েসেজ, দি আইস ড্রাগন, লিজিয়ন, প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে, দি আইভরি চাইল্ড ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রথমসারির জাতীয় পত্রিকা, সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন সময়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন কিশোর-ম্যাগাজিন ‘আজবদেশ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। বিশ্বখ্যাত ২০টির বেশি বই অনুবাদ করে বিভিন্ন স্তরের পাঠকের আস্থা অর্জন করেছেন, জিতে নিয়েছেন ভালোবাসা। তার অনুদিত কিছু বই বিভিন্ন সময় জাতীয় বেস্ট-সেলারের তালিকাগুলোতে ছিল। (লিখেছেন: লে: কর্নেল রাশেদুজ্জামান)

Share This Post On

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share via
Copy link