বাংলাদেশের উদ্ধারকারী জাহাজের গল্প

নদীর দেশ বাংলাদেশ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন কোনো নদীতে কোনো লঞ্চ বা ফেরি ডুবলেই যে দুইটা নাম খুব বেশি শোনা যেত সেগুলো হল, হামজা আর রুস্তম। হামজা নাম শুনে বাবুর্চি আর রুস্তম নাম শুনে কসাই মনে হলেও এই দুইটা আসলে বাবুর্চি বা কসাই কোনোটাই না। এই দুটো ছিল, বাংলাদেশের দুইটা নৌযান উদ্ধারকারি জাহাজ। কোথাও কোনো নদীতে কোনো নৌযান ডুবলে এই দুই বুড়া জাহাজ ছুটত উদ্ধার করতে।

বুড়া বলছি তার কারণ সারাজীবন টিভির সংবাদ আর  খবরের কাগজে এই দুই জাহাজকে বুড়া বলতেই শুনেছি আমরা। আমি যতদিন ধরে এই হামজা আর রুস্তমের নাম জানি, ততদিন ধরে এটাও জানি যে এই দুই মেয়াদোত্তির্ন জাহাজ দিয়েই নৌ উদ্ধারকাজ চালায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএ।

হামজা বেশি বুড়া, তাকে খরিদ করা হয় ১৯৬৪ সালে, মানে পাকিস্তানের সময়। আর এরপরে রুস্তমকে খরিদ করা হয়, ১৯৮৩ সালে। এই দুই উদ্ধারকারির প্রত্যেকটির উত্তোলন সক্ষমতা ৬০ টন করে। অর্থাত্‌ এরা দুইজনে মিলে একসাথে ১২০টন ওজন তুলতে পারে। অভ্যন্তরীণ নৌরুটে যে কার্গো জাহাজগুলো চলাচল করে সেগুলো ৩০০-৫০০ টন বা আরও বেশি মালামাল বহন করে। এইসজ জাহাজ ডুবলে তো আর ৬০ টন সক্ষমতার উদ্ধারকারি দিয়ে কাজ হবে না। এইজন্য দুই ভাই মিলে দৌড় দিত ঘটনাস্থলে, এবং বেশিরভাগ সময়ই ডুবে যাওয়া নৌযান উদ্ধার করা সম্ভব হত না।

এই যখন বাস্তবতা তখন ২০১২ সালে বাংলাদেশের তত্‌কালীন সোনার সরকার আরও দুইটা উদ্ধারকারী জাহাজ ক্রয় করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। এই উদ্ধারকারী জাহাজ কেনাতেও নাকি দুর্নীতি হয়েছে বলে গণমাধ্যমে নিউজ পড়েছি।বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা এক পত্রিকায় বলেছে, কোরিয়ান কোম্পানি নাকি কম সক্ষমতার জাহাজ পাঠিয়েছে, বাংলাদেশে দক্ষ লোক না থাকায় আমরা নাকি সেটা বুঝতেই পারিনি। এই হল অবস্থা। যাইহোক, ২০১২-১৩ সালের দিকে কেনা এই নতুন দুই উদ্ধারকারী জাহাজের নাম হইল, প্রত্যয় আর নির্ভীক। এগুলোর প্রত্যেকটার ভার উত্তোলন সক্ষমতা ২৫০টন। 

বরিশালে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক নামে একটা পার্ক আছে। পার্কটা কীর্তনখোলা নদীর তীরে। কিছুদিন আগে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম তো সেখানে গিয়েই চোখে পড়ল, ‘নির্ভীক’ নামের জাহাজটা। বিআইডব্লিউটিএ-এর জেটিতে নোঙর করা। এখানেই বিআইডব্লিউটিএ-এর অফিস। সাথের পন্টুনেরই উদ্ধারকারী ইউনিটের অবস্থান। গুগল ম্যাপ থেকে অন্তত তাই জানা গেল। মুক্তিযোদ্ধা পার্কের একপাশে বরিশাল ফেরিঘাট, অন্যপাশে অ্যাডামস ইডেন ট্রলার ঘাট। আশে পাশেই আছে বেলস পার্ক, বান্দ রোড। বরিশাল সদরের এদিকটার সবগুলো জায়গার নাম ইংরেজি কেন সেটাই ভাবছি। এছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের আশেপাশেই আছে বরিশাল ড্রেজার বেইজ আর নৌবহর কেন্দ্র।

আবার উদ্ধারকারী জাহাজের কথায় ফেরত আসি। বেশ বড়সড় সাইজের দশাসই চেহারা নির্ভিকের। দেখতে মজাই লাগে। কিন্তু অনেক জলযান এই বাংলাদেশেই আছে যেগুলো এর চেয়েও বড়। জাহাজটাতে উঠে দেখা গেলে ভালো হত কিন্তু সঙ্গতকারণেই এই জাহাজে ওঠা নিষেধ।

এখন শঙ্কর ব্যাপার হল, বাংলাদেশ সরকারের এই চারটা উদ্ধারকারীর সম্মিলিত সক্ষমতা ৬০০ টন। মালপত্র সমেত ৫০০ টনের বেশি ভরের কোনো কার্গো বা লঞ্চ ডুবে গেলে এই চারজন মিলেও কি উদ্ধার করতে পারবে? সেই আলোচনায় না যাই। পত্র পত্রিকায় এই ব্যাপারে অনেক প্রফেশনাল আলোচনা আছে। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার দুই হাজার টন সক্ষমতার আরও একটা উদ্ধারকারী জাহাক কেনার পরিকল্পনা নিয়েছিল। পরবর্তীতে সেই কার্যক্রমের কী হয়েছে সেব্যাপারে কোনো খবরা খবর চোখে পড়েনি।

মাঝে মাঝে মনে হয়, নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে খুব ভালো একটা নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা যদি তৈরি করা যেত তাহলে সেটা কি সবদিক থেকে বেশি লাভজনক হত কিনা। সড়ক কেন্দ্রীক যোগোযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি যদি একটা ভালো, সমৃদ্ধ, সুশৃঙ্ক্ষল, বানিজ্যিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা পুরো দেশব্যাপী থাকত তাহলে সেটা অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সাশ্রয়ী, পরিবেশের ও প্রতিবেশের জন্য লাভজনক ও উপকারি এবং টেকসই ব্যবস্থা হত কিনা সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই আরও আওয়াজ তুলবেন, কথা বলবেন।

কারণ সাম্প্রতিক কালে ঢাকার আশেপাশে বেশ কিছু নৌ-গণযোগাযোগ ব্যবস্থাপনা নাগরিক জীবনে এনেছিল শান্তি এবং প্রশংসিতও হয়েছিল। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের আরও অনেক উদ্যোগের মত সেগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর এসব ঘটনা এত বেশি যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভালো এবং জনবান্ধব কোনো উদ্যোগ টিকবে না সেটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন- নগর পরিববহন, ঢাকার সার্কুলার বাস, ডিজিটাল টিকেটিং, ওয়াটার বাস প্রকল্প, ইত্যাদি। 

যাইহোক, আলোচনা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে গেল। আমার বাউন্ডুলে ঘোরাঘুরিতে হয়তো একদিন বাকি তিনটা উদ্ধারকারি জাহাজ (প্রত্যয়, রুস্তম, হাসজা)-এর সাথেও দেখা হয়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি কখনও দুই হাজার মেট্রিকটন সক্ষমতার উদ্ধারকারী জাহাক কেনে হয়তো সেটাও দেখা হয়ে যাবে। তখনও আরও বিস্তারিত কথা হবে।

মহিউল ইসলাম মিঠু

ঝালকাঠি

অক্টোবর ২০২৪

Author: Moheul I Mithu

মহিউল ইসলাম মিঠু কৌতুহলী মানুষ। জানতে ভালোবাসেন। এজন্যই সম্ভবত খুব অল্প বয়সেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পড়ার অভ্যাসটাই হয়তো ধীরে ধীরে লেখার দিকে ধাবিত করেছিল। তার পাঠকপ্রিয় অনুবাদ গুলোর মধ্যে রয়েছে: দি হবিট, দি লর্ড অফ দ্য রিংস, পার্সি জ্যাকসন, হার্ড চয়েসেজ, দি আইস ড্রাগন, লিজিয়ন, প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে, দি আইভরি চাইল্ড ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রথমসারির জাতীয় পত্রিকা, সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন সময়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন কিশোর-ম্যাগাজিন ‘আজবদেশ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। বিশ্বখ্যাত ২০টির বেশি বই অনুবাদ করে বিভিন্ন স্তরের পাঠকের আস্থা অর্জন করেছেন, জিতে নিয়েছেন ভালোবাসা। তার অনুদিত কিছু বই বিভিন্ন সময় জাতীয় বেস্ট-সেলারের তালিকাগুলোতে ছিল। (লিখেছেন: লে: কর্নেল রাশেদুজ্জামান)

Share This Post On

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share via
Copy link
Powered by Social Snap