যোগাযোগের দ্বৈরথ: বাংলার সেই সুয়েজ খাল ও সর্বোচ্চ সেতুযোগাযোগের দ্বৈরথ:
আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে। একদম সঠিকভাবে বললে, এখন থেকে ১০৭ বছর আগে, ১৯১৮ সালে। রাইট ভ্রাতাদ্বয় (উইলবার রাইট আর অরবিল রাইট) বিমান আবিষ্কার করেছেন মাত্র পনেরো বছর হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছর। আন্তর্জাতিক গণপরিবহন ও যোগাযোগে এখনকার মত আকাশপথের জয়জয়কার নেই। গণপরিবহনে আকাশপথের ভূমিকা আক্ষরিক অর্থেই শূন্য। আকাশযানের ব্যবহার সামরিক ক্ষেত্র আর ডাক আনানেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদিও বিশ্বের প্রথম বানিজ্যিক এয়ারলাইন ততদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু অ্যাভিয়েশন শিল্প তখনও শৈশবে। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ আর পরিবহনের মূল মাধ্যম তখন জলপথ। ওই সময় বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে খনন করা হয় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক কৃত্রিম খাল বা চ্যানেল। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের অন্যান্য অংশের সাথে বাংলার নৌপথের দূরত্ব কমানো।ঝালকাঠি পৌর শহরের গাবখান থেকে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার আমড়াঝড়ি পর্যন্ত খনন করা হয় কৃত্রিম চ্যানেল। এই চ্যানেলর একদিকে ঝালকাঠি অংশে সুগন্ধা, বিষখালী ও ধানসিঁড়ি নদীর মোহনা এবং পিরোজপুর অংশে আছে সন্ধ্যা ও কচা নদী। খুবই বুদ্ধিদীপ্তভাবে খনন করা এই কৃত্রিম চ্যানেলই হল গাবখান চ্যানেল বা গাবখান খাল। ঝালকাঠির গাবখান এলাকা থেকে শুরু হয়েছে, তাই নামকরণ করা হয়েছিল গাবখান চ্যানেল। যদিও অনেকে একে গাবখান নদীও বলে, এমনকি গুগল ম্যাপেও লেখা ‘গাবখান রিভার’, কিন্তু এটা মূলত একটা খাল এবং বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম খাল। বাংলার সুয়েজ ক্যানাল।
পিরোজপুরের সন্ধ্যা নদী আর ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীকে সরাসরি যুক্ত করেছে কমবেশি ২০ মিটার গভীর এবং ২০০ মিটার প্রস্থের এই কৃত্রিম খাল। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোর নাম সুন্দর; সন্ধ্যা, সুগন্ধা, ধানসিড়ি, বিষখালি, রূপসা, কীর্তনখোলা, কালিজিরা, পায়রা, বলেশ্বর; যেন কবিরা এসে নামকরণ করে গেছেন। অবশ্য সত্যিই ধার্নসিড়ি নদীটার নামকরণ করেছেন একজন কবি, আমাদের সবার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাস। এই নদীর নামকরণেই ইতিহাস পড়তে গিয়ে পেলাম যে, আগে ধাঁনসিঁড়ি নদীর নাম ছিল ধানসিদ্ধ নদী। পরে জীবনানন্দ দাস ধানসিদ্ধ বাদ দিয়ে নামকরণ করেন ধানসিঁড়ি। যাইহোক, বাংলার সুয়েজ ক্যানেলের গল্পে ফেরত আসি। ১৯৫০ সালে চালনা বন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গাবখান চ্যানেল আন্তর্জাতিক নৌরুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৮৭ সালে এই চালনা বন্দরের নাম পরিবর্তন করে করা হয় মোংলা বন্দর, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। আন্তর্জাতিক নৌরুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হওয়ার পর, এই চ্যানেল ঢাকা-চট্টগ্রাম নৌপথের দূরত্ব কমিয়ে ফেলে ১১৮ কিলোমিটার।
ইতিহাস পুণরাবৃত্তি পছন্দ করে না। সম্ভবত কাকতালীয় ভাবেই, দেশের বৃহত্তম এই কৃত্রিম খালের উপরেই শোভা পাচ্ছে দেশের উচ্চতম সেতুটা। গাবখান চ্যানেলের উপর ২০০২ সালে নির্মিত হয় পঞ্চম চীন বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু। অফিসিয়াল নাম পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু হলেও, সেতুর জনপ্রিয় আর আদরের নাম গাবখান সেতু। স্থাপত্য হিসেবেও এই সেতু খুবই দৃষ্টি নন্দন। লাল রঙের রেলিংওয়ালা সেতু দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। এবং সবুজে ঘেরা গাবখান চ্যানের পটভূমিতে সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস এই সেতু দিনের একেক সময় একেক রকম সুন্দর হয়ে উঠতে থাকে। জোয়ার ভাটার সঙ্গে যেহেতু গাবখান চ্যানেলে পানি প্রতিদিনই কমে-বাড়ে, এই পটর্ভমির পরিবর্তনের সাথে সেতুর চেহারাও যেন বদলে যায়। সেতুর নিচ দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌপথের নৌযানগুলো যেন খুব সহজে চলাচল করতে পারে সেজন্য চ্যানেলের মাঝখানে কোনো পিলার বসানো হয়নি। চ্যানেলের দুই তীরের কাছাকাছি দুটো করে পিলার বসিয়ে দেয়া হয়েছে সেতুর দীর্ঘতম স্প্যানের ভর বহন করার জন্য। দীর্ঘতম এই স্প্যানের দৈর্ঘ ১৬২.৫ মিটার। সবমিলিয়ে স্থাপনা হিসেবেও এই সেতু অনন্য, অন্য সব সেতুর চেয়ে আলাদা।
সন্ধ্যা হলেই আশেপাশের লোকজন বেড়াতে আসে এই সেতুতে। জনসমাগম হওয়ায় সেতুর দুই পাড়ে অনেকগুলো খাবারের দোকান, চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে।
গাবখান চ্যানেলের দুই পাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ মনোরম। পাড়েরর বড় বড় গাছগুলোর অনেকগুলোই হেলে থাকে পানির উপর। দূর থেকে দেখতে খুবই মনোহর। আবার চাইলে বিকেলে নৌকা ভাড়া করেও ঘোরা যায় চ্যানেলে। গাবখান টোল ঘাটের পাশেই সবুজের গালিচা বিছানো ঝালকাঠি ইকো পার্ক। এলাকার ব্যাটারি-অটোরিক্সার ড্রাইভারা গাবখান পার্ক হিসেবে চেনে। সবমিলিয়ে প্রকৃতি পিপাসুদের জন্য এই এলাকা যে বেশ উপাদেয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমাদের এই সোনার দেশে কিছুই নিয়ম মেনে হয় না। চ্যানেলের দুই পাশে সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠতে শুরু করেছে অপরিকল্পিত ছোট ছোট মিল কারখানা। এরা শুধু গাবখানের তীরের সবুজই নষ্ট করছে না, নষ্ট করছে মৌলিক সৌন্দর্য আর প্রাণের দর্শনও। এখানে হয়তো অনেকের মনে হতে পারে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে আমি খাটো করে দেখছি। কিন্তু তা মোটেও নয়, সুন্দরকে সুন্দর রেখে আর্থিক দিক থেকে আকাশ ছোঁয়ার বহু উদাহরণ পৃথিবীতে আছে। এছাড়া গাবখান চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের কথাও অনলাইনে একটু খুজলেই পাওয়া যায়।
বাংলার সুয়েজ খাল এবং সবচেয়ে উঁচু সেতুর গল্প আজকে এখানেই শেষ করি। যদিও বদলে যাওয়াই পৃথিবীর নিয়ম, তবুও বাংলার যোগাযোগের এই দ্বৈরথ বহুদিন আমাদের গর্বের এবং সৌন্দর্য তৃষ্ণার পরিচায়ক হয়ে থাকবে এটাই প্রত্যাশা। আর বদলটা যদি ধনাত্মক দিক হয় তাহলে তো কথাই নেই, সোনায় সোহাগা।








লেখার চেষ্টা করছি।