লিজিয়ন – প্রথম অধ্যায়

অনুবাদ বইয়ের একটা ভালো চাহিদা আছে। সবসময় ছিল। সম্ভবত থাকবেও। আজকাল অনুবাদকের সংখ্যাও অনেক। তারমধ্যে সবাই ভালো বা আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেন এমন নয়। অনেককে বোঝেন না, অনেকে পারেন না, অনেকে অনুবাদ মানে শুধু ইংরেজিকে বাংলা করাই বোঝেন। এরকম অনুবাদক সম্ভবত খুব বেশি পাওয়া যাবে না যারা বইয়ের সাহিত্যিক দিকটাকেও গুরুত্বের সাথে দেখেন। আবার বই ছাপলে বিক্রি হবে, টাকা পাওয়া যাবে। তাই প্রকাশকরা মানের দিকটায় নজর দিতে চান না বা পারেন না। তবে আমার ধারনা চান না। যাই হোক, একই সব বাস্তবতার মধ্যে পাঠক পড়ে যান ফ্যাসাদে। বইটা কি কিনব নাকি কিনব না? নাকি অযথাই টানা নষ্ট হবে, বিরক্ত লাগবে, ইত্যাদি টানাপোড়েন। এইজন্য আমি সাধারণত আমার কাজগুলোর একটা অধ্যায় পাঠকের সাথে শেয়ার করি, যাতে পাঠক নিশ্চিত হতে পারেন।

কয়েকদিন আগে ইবুক আকারে প্রকাশিত হল বিখ্যাত আমেরিকান লেখক ব্র্যান্ডন স্যান্ডারসনের ‘লিজিয়ন’। বইয়ের প্রথম অধ্যায়টা এখানে সংযুক্ত করে দিচ্ছি।

প্রথম অধ্যায়

বই: লিজিয়ন
লেখক: ব্র্যান্ডন স্যান্ডারসন
অনুবাদ: মহিউল ইসলাম মিঠু

অধ্যায় এক
আমার নাম স্টিফেন লিডস। আর দশজনের মত না হলেও বেশ সহজ, স্বাভাবিক, আর সাধারন একজন মানুষ আমি। কিন্তু আমার হ্যালুসিনেশনের মানুষ গুলো একটুখানি অস্বাভাবিক আর অনেকটা অসাধারন।
জেসির রুম থেকে পিস্তলের গুলির শব্দ আসছে। এত বেশি আওয়াজ যে মনে হচ্ছে কেউ যেন আতশবাজি ফুটাচ্ছে। (হ্যালুসিনেশনে আমি যে কয়েকজনকে দেখি তাদের একজন জেসি। ওর বিশাল দেহের মত ওর নামটাও বিশাল। ওর বিশাল নামটাকে ছোট করে জেসি বানিয়ে নিয়েছি নিজের সুবিধার্থে। সবধরনের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোয় ওর মত পারদর্শী কাউকে পাওয়া মোটেও সহজ কথা নয়, অন্তত আমার তাই মনে হয়!) জেসির রুমে ঢোকার দরজাটার পাশে বেশ কিছু ইয়ারপাফ ঝোলানো থাকে সবসময়। সেখান থেকে একটা ইয়ারপাফ নিয়ে কানে লাগাতে লাগাতে জেসির রুমে ঢুকলাম আমি। জেসির কানেও একটা ইয়ারপাফ, ঘরের ভেতর গান বাজছে উঁচু ভলিয়মে। জেসির হাতের পিস্তলটা দেয়ালে টাঙানো ওসামা বিন লাদেনের একটি ছবির দিকে তাক করা। ছবিটা প্রায় ঝাঝড়া হয়ে গেছে। এত বেশি ফুটো যে খুব ভালো ভাবে না দেখলে কার ছবি বুঝতে কষ্ট হয়।
আমি ঘরে ঢুকেছি সেটা বুঝতে পারেনি জেসি। ওর একটু পেছনে দাড়িয়ে বললাম, “তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”
জেসি আমার কথা শুনতেই পেল না। আমিও খুব বেশি কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। কে জানে, হঠাৎ চমকে উঠে যদি আমার উপরই গুলি চালিয়ে বসে! আমার হ্যালুসিনেশন যদি আমাকেই গুলি করে তাহলে ফলাফল কি হবে সেটা এখনও জানি না। আমার মস্তিষ্ক ব্যাপারটা কিভাবে নেবে ঈশ^রই জানেন। তাই রিস্কটা না নেয়াই ভাল।
একটু দূরে থেকেই আমি রীতিমত জেসির নাম ধরে চিৎকার করলে লাগলাম। কিন্তু ওর কানে যেন কিছুই ঢুকছে না। শেষপর্যন্ত পিস্তলের ম্যাগজিন খালি হওয়ার পর আমার অস্তিত্ব টের পেল সে।
“হেই, স্টিফেন! কি খবর!” খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল জেসি। জেসি সবসময়ই এমন আন্তরিকভাবেই কথা বলে, কিন্তু ওর এই ভালোমানুষীতে ভোলার পাত্র নই আমি। ইয়ারপাফ আর গানের শব্দ ভেদ করে কথা বলার জন্য রীতিমত চিৎকার করতে হচ্ছে জেসিকে, “শুটিং প্র্যাকটিস করবে নাকি কিছুক্ষণ? একটু একটু অভ্যাস থাকাটা ভালো। কখন কি কাজে লাগে বলা তো যায় না!”
বলতে বলতে পিস্তলে নতুন ম্যাগজিন ভরতে শুরু করল। পিস্তলটা ওর হাত থেকে নিয়ে আমি বললাম, “আমারদের এই বিরাট ম্যানশনে খুব সুন্দর একটা শুটিং রেঞ্জ আছে। প্র্যাকটিসটা ওখানে গিয়ে করলে তো ক্ষতি নেই!”
টেবিলের উপর থেকে মিউজিক প্লেয়ারের রিমোর্টটা নিয়ে ভলিউম কমিয়ে দিলাম। পিস্তল চালানো প্র্যাকটিস করার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই দেখে প্রায় ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে নিল জেসি। এভাবে পিস্তল নিয়ে টানাটানি করাটা যে কোন সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই অনেকটা আঁতকে উঠে বললাম, “আরে, আস্তে!” পরমূহুর্তে আপনমনেই বলে উঠলাম, “হ্যালুসিনেশনের পিস্তল দিয়ে অবশ্য ভয়ের কিছু নেই।”
আমার পরের কথাটা সম্ভবত কানে পড়েছিল জেসির। তীর্যক একটা দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে।
এখানে একটা মজার কথা বলে রাখা উচিত। আমি যাদের হ্যালুসিনেশনে দেখি, তাদের প্রায় সবাই মোটামুটিভাবে জানে যে তারা আমার কল্পনা। ব্যাপারটার সাথে তারা কিভাবে যেন নিজেদের মানিয়েও নেয়। এনিয়ে ওদের মধ্যে কোনো আফসোস বা এইজাতীয় কিছু আছে কিনা সেব্যাপারে আমি নিজেও নিশ্চিত নই। কিন্তু তারা সবকিছু জানে এবং তাদের অস্বিত্ব শুধু আমার কল্পনায় এই ব্যাপাটাকে তারা খুব সিম্পলি নেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু জেসি। নিজেকে কোনোভাবেই হ্যালুুসিনেশন বা ‘নিতান্তই কল্পনা’ ভাবতে রাজি নয় সে। তাই আমার পরের কথাটা তাকে বেশ ভালোরকম বিরক্ত করেছে, সেটা বেশ বুঝতে পারলাম।
হয়তো বিরক্তিটা আড়াল করার জন্যই আবার লাদেনের প্রায় ঝাঁজড়া হয়ে যাওয়া ছবিটার দিকে আবার পিস্তল তাক করল জেসি।
ওকে পিস্তল তাক করতে দেখে আমি বললাম, “আবার শুরু করলে? আর তাছাড়া লাদেন অলরেডি মারা গেছে। ওকে এত গুলি করে লাভটা কি?”
“কিসের মারা গেছে! সব লোক দেখানো! তুমিও যদি এসব নাটক বিশ^াস কর তাহলে তো…” গজগজিয়ে বলতে শুরু করেও থামতে বাধ্য হল জেসি।
দরজা থেকে আওয়াজ আসল, “স্টিফেন!”
পেছনে তাকিয়ে দেখি দরজায় টোবিয়াস দাড়িয়ে আছে। টোবিয়াসও আমার আরেকজন হ্যালুসিনেশন। হালকা-পাতলা গড়নের লোকটার মাথার চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে। চেহারায় বয়সের সাথে সাথে অভিজ্ঞতার ছাপও স্পষ্ট।
“লোকটাকে আর কতক্ষণ এভাবে অযথা বসিয়ে রাখবে তুমি, স্টিফেন?” বিরক্তি মেশানো গলায় বলল টোবিয়াস।
“যতক্ষণ না বিদায় হয়, ততক্ষণ!” বেশ শানিত গলায় কথাটা বলেই জেসির রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।
হলওয়েতে আমার সাথে হাটতে শুরু করল টোবিয়াস! এদিকে জেসি আবার শুটিং শুরু করেছে। সঙ্গতকারনেই বিরক্ত হলাম খুব। আমার বিরক্তিটা সম্ভবত চেহারাতেও প্রকাশ পাচ্ছিল। তাই টোবিয়াস বলল, “তুমি যাও লোকটার সাথে কথা বল, আমি জেসির সাথে কথা বলছি!”
“যা ইচ্ছা হয় কর তোমরা!” বলেই টোবিয়াসকে হলওয়ের মাথায় রেখে চলে আসলাম আমি।
আমার এই বিরাট আলিশান ম্যানশনে সাতচল্লিশটা রুম আছে। আমি চলে আসলাম একেবারে কোণার একটি ছোট ঘরে। পার্সিয়ান কার্পেট বিছানো ঘরের মেঝেতে। কাঠের প্যানেল করা ঘরটার ডেকোরেশন আমার খুব পছন্দ। ঘরের মাঝামাঝির দিকে, কালো চামড়ায় মোড়ানো একটা সোফা পাতা। রুমে ঢুকেই ধপাস করে পড়লাম সোফার উপর।
সোফার পাশে নিজের চেয়ারে বসে আছে আইভি। সোফায় বসতে না বসতেই জেসির গোলাগুলির দিকে ইঙ্গিত করে আইভি বেশ ঝাঝালো গলায় বলল, “এই ঠুসঠাস কি চলতেই থাকবে?”
“টোবিয়াস গেছে কথা বলতে।” অনাসক্তভাবে বললাম আমি।
“আচ্ছা!” খানিকটা অন্যমনস্কভাবে কথাটা বলে নিজের নোটপ্যাডের দিকে মনোযোগ দিল আইভি। আইভির বয়স চল্লিশের কোটায় পৌছেছে। আজ গাঢ় রঙের একটা বিজনেস স্যুট পড়ে আছে। চুলগুলো মাথার উপর খোঁপা করে বাঁধা। বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে। আমার সবচেয়ে পুরোনো হেলুসিনেশনগুলোর মধ্যে আইভি একজন।
“আজকাল তোমার হেলুসিনেশনরাও তোমার কথা শুনতে চাইছে না। ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছ তুমি?” একটু ঠেস দেয়া গলায় জিজ্ঞেস করল আইভি।
এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি নিজেও বেশ বিরক্ত। কিন্তু সেটা তো আর প্রকাশ করা যায় না! তাই মুখ বাঁচানোর জন্য বললাম, “এমনিতে তো সবাই শোনে। আর জেসির ব্যাপারটা তো আলাদাই। ও শুরু থেকেই এমন!”
“তারমানে তুমি স্বীকার করতে চাইছ না, তাই তো?”
“ কোন ব্যাপারটা?”
“এই যে তোমার হেলুসিনেশনরা আজকাল তোমার কথা শুনতে চাইছে না,আর এই ব্যাপারটা যে দিন দিন বাড়ছে…” বলতে বলতে থেমে গেল আইভি।
আমি কিছু বললাম না।
আইভি তার নোটপ্যাডে কিছু একটা লিখল।
“তুমি আবার আরেকটা কেস ফিরিয়ে দিয়েছ শুনলাম!” বলল আইভি।
“এসব কেস দেখার সময় নেই এখন! আমি ব্যস্ত।”
“কি নিয়ে ব্যস্ত শুনি! আরো বেশি পাগল হওয়া নিয়ে?”
“বাজে বক না!” বেশ ঝাঝালো গলায় বললাম, “আমি মোটেই পাগল হয়ে যাচ্ছি না। পুরোপুরি স্বাভাবিক আছি। এটা আমার কথা না, আমার সাইকিয়াট্রিস্ট নিজে বলেছেন শেষবার চেক করার সময়!”
“কোন সাইকিয়াট্রিস্ট বলল? যে সাইকিয়াট্রিস্ট তোমার হেলুসিনেশনে আসে?”
“না। সেই সাইয়াট্রিস্ট না। আসল সাইকিয়াট্রিস্ট।”
আইভি থেমে গেল। ওদিকে গুলির শব্দও বন্ধ হয়েছে। একটু স্বস্তি পেলাম। হাতের আঙুল কপালে ছুঁইয়ে নিঃশব্দে একটা লম্বা নিঃশ^াস ছেড়ে বললাম, “সবাই যেটাকে পাগলামি বলে, আর যেটাকে স্বাভাবিকতা বলে, এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্যটা খুবই ফ্লুইড। একজন মানুষ যাকে সবাই স্বাভাবিক বলছে তার মধ্যে কিছু পাগলামি থাকাটা যেমন অস্বাভাবিক না। ঠিক একইভাবে, আরেকজন মানুষ যাকে সবাই কিছুটা পাগল ভাবছে তারমধ্যে স্বাভাবিক মানুষের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকতেই পারে। সহজভাবে বললে, একজন ব্যক্তি একই সময়ে একদলের কাছে পাগল আরেকদলের কাছে স্বাভাবিক হতেই পারে।”
“তুমি কি এই হ্যালুসিনের সমস্যাকে সবকিছুকে স্বাভাবিক বলতে চাইছ?”
“সবকিছু তো স্বাভাবিকই চলছে…”
এমন সময় টোবিয়াস ঘরে ঢুকল, হালকা বিরক্ত গলায় বলল, “স্টিফেন, ওই ভদ্রলোক তো এখনও বসে আছে। আর তুমি এখানে বসে আছ!”
“কী!” চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো আইভি, “ বেচারাকে চার ঘন্টা ধরে বসিয়ে রেখেছ তুমি!”
“আচ্ছা ঠিকাছে। বিদায় করছি এখনই!” বলেই লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লাম আমি।
রুম থেকে বেরিয়েই উইলসনের সামনে পড়লাম। উইলসন আমার বাটলার, সত্যি সত্যি রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ, আমার হেলুসিনেশন নয়।
আমাকে দেখেই উইলসন বলল, “মাস্টার, লোকটাকে অযথাই চারঘন্টা ধরে বসিয়ে রেখেছেন…”
খানিকটা বিরক্ত লাগল আমার, “আমি কি করব, কি করব না সেটা বোঝানোর জন্য তোমাকে বেতন দিই না আমি!”
কথাটা শুনে কিছুটা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো উইলসন। লজ্জা পেয়ে গেলাম, কথাটা এভাবে বলা উচিত হয় নি। মানুষ হিসেবে উইলসন অসাধারন, আমার প্রয়োজনীয়তা-অপ্রয়োজনীয়তার দিকেও সবসময় সচেতন নজর থাকে ওর। ওর চেয়ে ভালো বাটলার পাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব, বিশেষকরে যখন হেলুসিনেশন সংক্রান্ত বিরাট সমস্যা আছে আমার…“সরি উইলসন! কিছু মনে করো না। কেন যেন ভালো লাগছে না…”
“লেমনেড খাবেন? আনব?” আমার কথাটা উড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল উইলসন। ঠিক এজন্যই ওর চেয়ে ভালো বাটলার পাওয়া সম্ভব না।
“আমাদের তিন জনের জন্যই আনো তাহলে…” বলেই আইভি আর টোবিয়াসের দিকে তাকালাম, উইলসন অবশ্যই ওদের দেখতে পাচ্ছে না, “ওই লোকটার জন্যও এনো একটা…”
“আমারটায় বরফ ছাড়া।” বলল টোবিয়াস।
“আমি লেমোনেড নেব না, একগ্লাস পানি হলেই চলবে।” বলল আইভি।
“টোবিয়াসেরটা বরফ ছাড়া আর আইভির জন্য শুধু এক গ্লাস পানি।” উইলসনকে বললাম আমি।
উইলসন সব বুঝে নিয়ে চলে গেল লেমনেড আনতে। উইলসন আসলেই অসাধারন। ও না থাকলে এতদিনে সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যেতাম আমি।

পোলো শার্ট পড়া একটা ছেলে সিটিং রুমে অপেক্ষা করছিল। আমরা ঢুকতেই চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল, “মাস্টার লিজিয়ন!”
আজকাল দেখছি অনেকেই ‘লিজিয়ন’ বলে ডাকছে আমাকে। নামটা খুব একটা পছন্দ করতে পারছি না। খুবই বিখ্যাত এক সাইকোলোজিস্ট এই নামটার জনক। ভদ্রলোক এত বিখ্যাত যে তার মুখ থেকে লিজিয়ন শব্দটা বের হওয়ার পর ভাইরাল হতে বেশি সময় লাগেনি। সাইকোলোজিতে এই লোকের প্রতীভা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও, নাটকীয়তায় তার প্রতীভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর কিছু পারুক না পারুক, প্রচুর নাটক করতে পারে এই ভদ্রলোক।
“শুধু স্টিফেন বলবেন, প্লিজ।” একটু বিরক্ত হয়ে বললাম। টোবিয়াস আর আইভির জন্য দরজাটা খুলে ধরে থাকতে থাকতে জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর বলুন, কি করতে পারি আমরা আপনার জন্য?”
“আমরা?” একটু কনফিউজড হয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।
“আমরা… মানে… ওই কথার কথা আর কি!” খুব বেশি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে না গিয়ে কাটিয়ে গেলাম ব্যাপারটা। হ্যালুসিনেশন, টোবিয়াস, আইভি, এত কাহিনি এখন কে বুঝাতে যাবে এই ছেলেকে!
“আমি… আপনার কথা শুনেছি অনেক। সবাই বলে, কোনো ব্যাপারে যখন আর কেউ কিছু করতে পারে না তখন আপনিই নাকি শেষ ভরসা, তাই… আসলাম… এই আর কি!” কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে কথাগুলো বলল ছেলেটা। বোঝা গেল, যতটা সম্ভব সোজাসাপ্টা থাকার চেষ্টা করছে, আবার তাতে বিনয়ের কমতি যাতে না পড়ে সেটা ম্যানেজ করতে গিয়েই এই অস্বস্তি।
আমাকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে দেখে আবার বলতে শুরু করল ছেলেটা। এবার একটু সাবলীল, “আমি দু হাজার ক্যাশও নিয়ে এসেছি।” বলেই আমার নাম ঠিকানা লেখা একটা খাম টেবিলের উপর রাখল।
“কনসালটেশন পাওয়ার জন্য আপাতত এটুকুই যথেষ্ট!” বলেই খামটা খুলে টাকাটা দেখে নিলাম এক নজরে।
টোবিয়াস আমার দিকে একটু বিরক্ত চোখে তাকালো। লোকজনের কাছ থেকে এভাবে ছোটলোকি কায়দায় টাকা-পয়সা নেয়াটা কখনই পছন্দ হয় না ওর। কিন্তু ফ্রি সার্ভিস দিয়ে তো আর পেট চলবে না। তারমধ্যে এতগুলো হ্যালুসিনেশনগুলোর সবাইকে জায়গা দেয়ার মত এতবড় একটা ম্যানশনের খরচাপাতি চালানোও তো সহজ না। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ছেলেটার পোশাক-আশাকে বোঝা যাচ্ছে, এই ছেলে এই টাকা অ্যাফোর্ড করতে পারবে।
“হুম, এবার সমস্যাটা বলুন।” বললাম আমি।
“সমস্যা আমার বাকদত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে।” বলতে বলতে পকেটে হাত দিয়ে কিছু একটা বের করল ছেলেটা, “আমার ধারনা আমার সাথে প্রতারনা করা হচ্ছে।”
“আপনার জন্য গভীর সমবেদনা!” কাটাকাটাভাবে বললাম আমি, “কিন্তু আমরা প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর নই। এসব টিকটিকির কাজ করি না আমরা।”
আইভি এতক্ষন দাড়িয়ে দাড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল ছেলেটাকে। এবার ছেলেটার চারপাশে একবার ঘুরে আসল।
এদিকে আমার কথা শুনে ছেলেটা বলল, “সেটা আমি জানি। কিন্তু তারপরেও আপনার কাছে এসেছি কারন আর কেউ তো কিছুই করতে পারল না। সমস্যাটা হল, কিছুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আমার বাকদত্ত্বাকে।”
এটা শোনার পর একটু নড়েচড়ে বসল টোবিয়াস। রহস্য ভালোবাসে সে।
বুকের ওপর হাত বাধতে বাধতে আইভি বলল, “পুরো ঘটনা বলছে না ছেলেটা!” সেও তীক্ষè চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে।
“নিশ্চিত তুমি?” আইভিকে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ছেলেটা তো আর আইভিকে দেখতে পাচ্ছে না, তাই সে ভাবল, আমি ওকেই জিজ্ঞেস করেছি। বলল, “হ্যা! ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু একটা নোট রেখে গেছে।” বলতে বলতে একটা কাগজের ভাজ খুলে টেবিলের উপর রাখল। “সমস্যা হল, এই নোটগুলোর কোনো মানে বোঝা যাচ্ছে না। সাংকেতিক সূত্রের মত কিছু একটা। অনেকটা হেয়ালির মত!”
আমি কাগজটা তুলে নিলাম। লিস্টের মত করে কয়েকটা বাক্য লেখা। নোটগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে কাগজটা টোবিয়াসকে দিলাম।
নোটগুলোর দিকে একবার তাকিয়েই টোবিয়াস বলল, “এগুলো সব প্লেটোর উক্তি। সবগুলোই প্লেটোর ‘ফেড্রাস’ বই থেকে নেয়া। এই প্লেটো লোকটা আসলেই অসাধারন জানো তো! আজকের দিনেও অনেক মানুষ জানে না যে এই মহামতি প্লেটো আসলে জীবনের একটা লম্বা সময় কাটিয়েছিলেন ক্রিতদাস হিসেবে। প্রথমে যে মালিকের কাছে ছিলেন, সেই মালিক ছিল ভয়ানক অত্যাচারি। কিন্তু প্লেটোর কপাল ভালো, পলিটিকস বইটা নিয়ে অত্যাচারী মালিকের সাথে বিরাট ঝামেলা হয়। ফলে সেই অত্যাচারী মালিক তাকে বাজারে বিক্রি করে দেয়, আর তখন তাকে কিনে নিয়েছিল যে নতুন মালিক সে আগে থেকেই প্লেটোর কাজের সাথে পরিচিত ছিল, গুণগ্রাহী ছিল। নতুন মালিক তাকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেয়। আসলেই বড়ই অদ্ভূত মানবজীবন!” শেষের বাক্যটা বিড় বিড় করে বলল টোবিয়াস। একটু সুযোগ পেলেই জ্ঞান দিতে শুরু করা ওর স্বভাব।
টোবিয়াস হয়তো আরো কিছু বলত কিন্তু এমন সময় দরজাটা খুলে গেল। ঘরে ঢুকলো উইলসন। হাতে লেমোনেড আর পানির গ্লাস। দরজার ওপাশে জেসিকে দেখতে পেলাম। হাতে পিস্তল, তীক্ষè দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে ছেলেটাকে।
লেমোনেডের গ্লাস নিতে নিতে উইলসনকে বললাম, “অড্রেকে একটু পাঠিয়ে দিতে পারবে?”
“অবশ্যই, মাস্টার।” বলতে বলতে আইভি আর টোবিয়াসের দিকে গ্লাস এগিয়ে দিল উইলসন। বাস্তবে হয়তো এসবের কোনো কিছুই ঘটেনি কিন্তু আমি দেখলাম হাত বাড়িয়ে উইলসনের হাত থেকে গ্লাস প্রথমে নিল টোবিয়াস, তারপর নিল আইভি, নিতে নিতে সুন্দর একটা হাসি উপহার দিল উইলসনকে। হাসিটা সুন্দর।
উইলসন আমার হ্যালুসিনেশনের মানুষগুলোকে দেখতে পায়না। কিন্তু তারপরেও কিভাবে এত সুন্দর করে অভিনয় করে যায় কে জানে!
উইলসন যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অড্রে ঘরে ঢুকলো। গায়ে একটা বাথরোব জড়ানো। ভাবটা এমন যেন খুব তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছে, বাথরোব ছেড়ে কাপড় পড়ার সুযোগ পায়নি। সুন্দরি মেয়েরা নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। তবে বাথরোবটা দেখতে সুন্দর। অবশ্য বাথরোবটা সুন্দর নাকি অড্রের দেহসৌষ্ঠবের কারণে বাথরোটা সুন্দর লাগল সেব্যাপারে নিশ্চিত নই আমি।
অড্রে হালকা হাপাতে হাপাতে বলল, “খুব জরুরি কিছু মনে হচ্ছে?” ওর ভেজা চুল লেপ্টে আছে বুক আর কাধের উপর। হাপানোর কারনে ভেজা চুলে ঢাকা বুক আর কাঁধের মৃদু আন্দোলনে আরো আকর্ষনীয় লাগছিল মেয়েটাকে।
ওর দিকে প্রথমে নোটটা আর টাকার খামটা এগিয়ে দিলাম আমি। হাতে তুলে নিয়ে গভীর মনোযোগে দুটোর লেখাগুলো দেখল কিছুক্ষণ। তারপর বাথরোবের পকেট থেকে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করল। বাথরোবের পকেটে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস! আমার হ্যালুসিনেশনদের কর্তব্য-জ্ঞান বাড়ছে, বলতেই হবে!
ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা দিয়ে একবার খামটার উপরের লেখা আরেকবার নোটটা লেখাগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল অড্রে। এভাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল কয়েকবার।
তারপর আমার দিকে দুটোকেই এগিয়ে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “লেখা দুটো দেখতে কিছুটা আলাদা হলেও, দুটো লেখা একই ব্যক্তির!”
“এত কম লেখা দেখেই নিশ্চিত হচ্ছ কিভাবে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
মাঝখান থেকে ছেলেটা বলে উঠল, “কি নিশ্চিত হচ্ছি?”
আরো কিছু হয়তো বলত ছেলেটা কিন্তু ওকে হাত উঁচু করে থামিয়ে দিলাম আমি।
অড্রে বলল, “এতটুকু লেখাই যথেষ্ট! লেখার ধরন, হাত ঘুরানোর স্টাইল, এক লাইন থেকে আরেক লাইনের ব্যবধান, শব্দ থেকে শব্দের ব্যবধান, সব একই। অবশ্য দুটো লেখাকে আলাদা করার চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু দুটো লেখা যে একই ব্যক্তির সেব্যাপারে নিরানব্বই পার্সেন্ট নিশ্চিত আমি। আর এত চেষ্টা পরেও ‘ই’ বর্ণটা একই রকম থেকে গেছে।”
“হুমম! থ্যাংক ইউ, অড্রে!”
“তোমাকে বলেছিলাম, আমাকে একটা কুকুর এনে দিতে, মনে আছে?” বেশ আহ্লাদী স্বরে বলল অড্রে।
“না না কোনো দরকার নেই। এমনিতেই অনেক ঝামেলা, নতুন করে ঝামেলা আনার কোনো মানে হয় না।” একটু বিরক্তি দেখানোর চেষ্টা করলাম আমি।
“অযুহাত দেখিও না শুধু শুধু। এমন ভাব করছ যেন সত্যি সত্যিই কুকুর আনবে! কাল্পনিক কুকুর আবার ঝামেলা কি করবে? সবই তো মিথ্যে মিথ্যে। মিথ্যে মিথ্যে কুকুরকে মিথ্যে মিথ্যে খাওয়াবো আমি, মিথ্যে মিথ্যে খেলব ওর সাথে, মিথ্যে মিথ্যে ঘুরতে নিয়ে যাব, তোমাকে তো কিছুই করতে হচ্ছে না!” এক নিঃশ^াসে অনেকগুলো কথা বলে থামলো অড্রে।
“আচ্ছা ঠিকাছে! এখন যাও, এসব নিয়ে পরে কথা বলব!” বললাম আমি।
আমার দিকে কপট একটা তীর্যক দৃষ্টি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। হ্যালুসিনেশনের মানুষটা যখন নিজেই জানে যে সে একটা কল্পনা মাত্র, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই, তখন জটিলতা অনেক কমে যায়। সবকিছু বেশ সহজ মনে হয়।
পাশে তাকিয়ে দেখি, ছেলেটা হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, “হয়েছে আর অভিনয় করতে হবে না!”
“অভিনয়!”
“যথেষ্ট বড় হয়েছ তুমি। অবাক হওয়ার যে ভানটা তুমি করছ সেটা অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর এরপরে এরকম মিথ্যা নোট লেখার দরকার হলে, অন্য কাউকে দিয়ে লিখে নিও, নিজে লিখতে যেও না।” বলেই নোটটা ওর দিকে ছুড়ে দিলাম।
“প্লিজ! আমার গার্লফ্রেন্ড…” ধরা পড়ে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করল ছেলেটা।
“ও এরমধ্যেই গার্লফ্রেন্ড হয়ে গেল! কিন্তু প্রথমে তো বলেছিলে বাকদত্ত্বা! শোনো, এসব নাটক বন্ধ কর! তোমার আসল উদ্দেশ্য বুঝে গেছি।” সোজাসাপ্টা বললাম আমি।
“নাটক?”
“তুমি একটা কেসের ছুতোয় আমার কাছে এসেছ। কিন্তু আমাকে খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করাই তোমার আসল উদ্দেশ্য। সম্ভবত আমাকে নিয়ে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করছ তুমি। তোমার কি মনে হয়, এই চেষ্টা আগে কেউ করেনি? আর এখন তোমাকে দেয়ার মত সময়ও হাতে নেই। তাই ভদ্রলোকের মত বিদেয় হও!” বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম আমি।
“কিন্তু.. মি লিডস..” কিছু বলতে চাইলো ছেলেটা।
আমি সুযোগ না দিয়ে বললাম, “সিকিউরিটি ডাকতে হবে?”
“নাহ!” বলেই মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ছেলেটা।
* * *
“একটা ইন্টারভিউ মতন কিছু দিয়ে দিলেই পারতে! দু’হাজার অযথা গেল বেচারার।” বলল টোবিয়াস।
“এতগুলো মিথ্যে বলার পরেও…? ” টোবিয়াসের কথায় খুব বিরক্ত হয়ে বললাম, “ সত্য সত্য সব বললে ভেবে দেখতাম!”
“বেচারা! বৃষ্টির মধ্যে হেটে হেটেই বাড়ি যেতে হবে বোধহয়! দেখে তো মনে হল না, ফেরার ট্যাক্সি ভাড়াও পকেটে অবশিষ্ট আছে।” আফসোস ঝড়ল টোবিয়াসের গলায়।
“বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“এখনও হচ্ছে না। তবে হবে। স্ট্যান বলল কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে।” বলল টোবিয়াস। তারপর একটু থেমে আবার বলল, “আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না যে মাঝে মধ্যে ইন্টারভিউ বা এই জাতীয় কাজ কারবার করলে মন মেজাজ ভালো থাকবে?”
“রেফারেন্স, কেস-স্টাডি, ইন্টারভিউ, এগুলো তো আর কম করলাম না, তাই না? আজকাল খুব বিরক্ত লাগে এসব ঘ্যানঘ্যানানি!” ক্লান্ত গলায় বললাম আমি।
কথা শেষ হতে না হতেই ঘরে ঢুকল উইলসন। হাতে একটা ট্রে। ট্রের মাঝখানে আজকের যত চিঠিপত্র এসেছে সব সুন্দর করে পরিপাটি করে সাজানো। ট্রেটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। হাতে নিতে নিতে বললাম, “দেখ তো, ছেলেটা আসলেই বিদায় হল কিনা। পরে দেখা যাবে বের হওয়ার নাম করে কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। পরে আবার উটকো ঝামেলা বাধাবে!”
“জ¦ী, মাস্টার।” বলে দরজাটা ভেজিয়ে চলে গেল উইলসন।
চিঠিপত্রের দিকে মনোযোগ দিলাম আমি। বিল আর অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় চিঠি আগেই সরিয়ে রাখে উইলসন, তাই ওসব ছোট-খাট ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বিরক্ত হতে হয় না। প্রথমেই আমার সাইকোলোজিস্টের পাঠানো একটা খাম। সেটাকে ইচ্ছে করেই সরিয়ে রাখলাম। তারপর সাদা একটা খাম। বেশ বড়সড়। খামের উপর প্রেরকের কোনো নাম ঠিকানা লেখা নেই। ভ্রুঁ কুঁচকে খামটা ছিড়লাম।
খামের ভেতরে শুধু পাঁচ বাই আট সাইজের একটা ছবি। সাদাকালো। আর কিছু নেই। ছবিতে পাথুরে একটা সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছে। একটা জায়গায় পাথুরে সৈকত একটু খানি বিবর্ধিত হয়ে ঢুকে গেছে সাগরের ভেতর। বিবর্ধিত জায়গাটার উপর একটা ছোট গাছ দেখা যাচ্ছে। সৈকতের মূল অংশটাতেও একই রকম কিছু গাছ!
“খামের কোথাও কিচ্ছু লেখা নেই।” টোবিয়াস আর আইভির দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।
“তোমাকে কনফিউজড করার চেষ্টা মনে হচ্ছে। কৌতুহলে পড়ে যদি একটা ইন্টারভিউ দিয়ে দাও! ছেলেটার চেয়ে অন্তত ভালো বু্িদ্ধ ফেদেছে।” বিরক্তি মেশানো মন্তব্য আইভির।
“এরকম বোরিং একটা ছবি দিয়ে কনফিউজড করার চেষ্টা? যত্তসব গাধার দল!” জেসি আরো বেশি বিরক্তি দেখালো।
“কিন্তু ছবিটার মধ্যে কিছু একটা আছে! টোবিয়াস, কেমন চেনা চেনা লাগছে না?” কথাগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে গেল আমার।
টোবিয়াস আমার হাত থেকে ছবিটা নিল। অন্তত আমি তাই অনুভব করলাম। কে জানে ছবিটা হয়তো আমিই ধরে আছি, মনোযোগ দিয়ে দেখছি। কিন্তু আমার মন আমাকে দেখাচ্ছে যে টোবিয়াস একমনে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। মন যে কতভাবে খেলতে পারে!
একদিকে টোবিয়াস মনোযোগ দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে জেসি তাকিয়ে আছে টোবিয়াসের দিকে। হাতের পিস্তলের সেফটি অন-অফ করছে আনমনে।
জেসির এসব দেখে বেশ ঝাজিয়ে উঠল আইভি, “তুমি না সবসময় গান-সেফটির বয়ান দিতে থাকো? অযথা সেফটি অন-অফ করা কোন ধরনের সেফটির মধ্যে পড়ে?”
“বাজে বকবক করো না তো! সেফটি মেইনটেইন করছি আমি। আর পিস্তল যখন আমার হাতে তখন সেফটি অন-অফ ব্যাপার না। আর পিস্তলের ব্যারেল তো কারো দিকে তাক করা নেই। আর আগ্নেয়াস্ত্রের উপর আমার কন্ট্রোল নিয়ে কোনো সন্দেহ আছে নাকি তোমার? অন্য কারো বেলায় এসব উপদেশ ফলানোর চেষ্টা করো, কাজে আসবে!” আইভিকে উল্টো বয়ান শুনিয়ে দিল জেসি।
“আরে…..! তোমরা কি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকতে পারো না?” অধৈর্য হয়ে বলল টোবিয়াস। ওর চোখটা একটু চকচকে হয়ে উঠছে, হঠাৎ বলে উঠল, “হায় খোদা…!”
“তুমি কি শুরু করলে আবার, টোবিয়াস?” অনাসক্তভাবে বলল আইভি। টোবিয়াস মাঝে মাঝে বিভিন্নভাবে সবাইকে একটু ভরকে দেয়ার চেষ্টা করে, এরকম কিছু হবে ভেবেই আইভির এই প্রতিক্রিয়া। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম বেশ ভালোভাবেই।
জেসিও গলা খাকারি দিল।
কিন্তু কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না টোবিয়াসের মধ্যে। সে ছবির দিকে চোখ রেখেই বলল, “স্টিফেন, কম্পিটারের সামনে চল!”
আমি কোনো কথা না বলে, বসার ঘরের ডেস্কটপ কম্পিউটারের সামনে বসলাম। পাশে একটু উবু হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকালো টোবিয়াস, বলল, “লোন সাইপ্রাস লিখে সার্চ কর তো!”
করলাম। একই জায়গার অনেকগুলো ছবি ভেসে উঠল কম্পিউটারের স্ক্রিনে। একটা পাথরের উপর অনেকগুলো গাছ। অনেক বড় বড় গাছ। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, প্রতিটাই অনেক প্রাচীন।
“ধূর! আবার পাথর, আবার সাগর, আবার গাছ! কি শুরু করলে তোমরা?” পেছন থেকে জেসির গলা শুনলাম।
“এটা লোন সাইপ্রাস. টোবিয়াস! বিখ্যাত লোন সাইপ্রাস! নাম শোনোনি কখনও? ধারনা করা হয় এই গাছের বয়স অন্তত আড়াইশো বছর!” বলল টোবিয়াস!
“তাতে কি হয়েছে!” বলে উঠল আইভি।
সাদাকালো ছবিটা হাতে নিয়ে আমি বললাম, “কিন্তু এই ছবিতে এই গাছের যে ছবি দেখা তাতে এটার বয়স খুব বেশি হলে দশ হবে!”
“আরো কম হতে পারে!” আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল টোবিয়াস, “তার মানে এই ছবি যদি অরিজিনাল হয়, তাহলে এই ছবিটা তোলা হয়েছিল আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়। ক্যামেরা আবিষ্কৃত হওয়ারও বহু আগে!”

প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।।

বইটির ব্যাপারে সব বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন: লিজিয়ন বইপরিচিতি https://mithu.info/legion/

Author: MIM

মহিউল ইসলাম মিঠু কৌতুহলী মানুষ। জানতে ভালোবাসেন। এজন্যই সম্ভবত খুব অল্প বয়সেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পড়ার অভ্যাসটাই হয়তো ধীরে ধীরে লেখার দিকে ধাবিত করেছিল। বাংলাদেশে প্রথমসারির জাতীয় পত্রিকা, সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন সময়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন কিশোর-ম্যাগাজিন ‘আজবদেশ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। অনেকগুলো জনপ্রিয় বই অনুবাদ করে বিভিন্ন স্তরের পাঠকের আস্থা অর্জন করেছেন, জিতে নিয়েছেন ভালোবাসা। তার অনুদিত কিছু বই বিভিন্ন সময় জাতীয় বেস্ট-সেলারের তালিকাগুলোতে ছিল।

Share This Post On

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share via
Copy link