ঘুরে এলাম ষাটগম্বুজ মসজিদ

বহুদিনের ইচ্ছা ছিল ষাটগম্বুজ মসজিদটা ঘুরে আসার। বাংলাদেশের ৮০% জেলা ঘুরে ফেলার পরও একবারের জন্যও ষাটগম্বুজ মসজিদে যেতে না পারাটা একরকম অস্বস্তিকর। সেই অস্বস্তিটার পরিসমাপ্তি ঘটানোর ইচ্ছা বহুকাল ধরে মনের মধ্যে ছটফট করছিল। সম্প্রতি সুযোগটা পাওয়া গেল। কর্মজীবনে এসে বুঝতে পারছি, একটু ছুটি মিললে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়াটা বেশি আকাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। জীবনের প্রতিটা ফেজের একটা সৌন্দর্য আছে, এই আলসেমিটা সম্ভবত সংসার জীবনের সৌন্দর্য।

আসল কথায় ফিরে আসি। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল শেষমেষ ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে যাওয়ার সুযোগ হল। এরকম ঐতিহাসিক স্থানে গেলে আমার সময় খুব দ্রুত চলতে শুরু করে। দেখার যেন শেষই হতে চায় না। একবার পাহাড়পুর দেখতে গিয়ে শুধু টিলাটা দেখতেই আমার ৪-৫ঘন্টা সময় লেগে গিয়েছিল। সঙ্গীরা খুব বিরক্ত হয়েছিল, এত ছোট একটা জায়গা ঘুরে দেখতে এতক্ষণ লাগলো কেন সেটা নিয়ে নানানরকম প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল। অবশ্য এতটা সময় কেন লাগল সেটা আমার কাছেও পরিষ্কার নয়। একটু অস্পষ্টভাবে যে উত্তরটা মনে আসে সেটা হল, ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্তিক স্থানগুলোতে এমন অনেক কিছু থাকে যা দেখতে মনের চোখ দিয়েও তাকাতে হয়। সময়ের কথা বললাম কারণ, ওইদিন ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখার জন্য আমার হাতে সময় ছিল এক ঘন্টা।

 

সেই ক্লাস এইটের টেক্সট বুকে যে মসজিদের কথা পড়ার পর থেকেই যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা মনে লালন করছি, সেই জায়গাটা মাত্র একঘন্টায় দেখে ফেলতে হবে ভাবতেই বিরক্ত লাগছিল। তবুও সুযোগ যখন এসেছে তখন ছেড়ে দেয়া তো কাজের কথা না, নাই মামার চেয়ে কানা মামা তো ভালো।

ত্রিশ টাকায় টিকেট নিয়ে ঢোকার পরেই হাতের বামে পড়ল লালরঙের ঐতিহাসির সেই মসজিদ। ছবিতে অগণিতবার দেখেছি, কিন্তু সরাসরি দেখাটা রক্তে যে শিরশিরানি অনুভূতির জন্ম দেয় সেটার সাথে ছবিতে শতবার দেখারও তুলনা করা চলে না। ঢোকার পরে হাতের বামে খানজাহান আলীর কীর্তি আর ডানে ‘বাগেরহাট জাদুঘর’। জাদুঘরের সামনে গিয়ে সেটা না দেখে ফিরে আসা আমার স্বাভাবির আচরণের সাথে যায় না, কিন্তু কিছু করার ছিল না। সময় ছিল কম। এরপরেরবার যখন লম্বা সময় হাতে নিয়ে যাব তখন সাধ মিটিয়ে পনের শতকের মসজিদ দেখা শেষ করে তারপর জাদুঘর দেখে আসব। এটা ভেবেই মনকে প্রবোধ দিলাম।

মসজিদ প্রাঙ্গনের পরিপাটি ঘাসের মাঠ, সাজানো পাতাবাহারের গাছগুলোকে দেখে মনে হল বেশ ভালো দেখাশোনা হয় বিশ্বঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া এই মসজিদের। সাথে সাথে হ্যান্ডমাইকে অনবরত দর্শনার্থীদের প্রতি আহবান চলে, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো কাজ করবেন না।” তারমানে কী এখানে প্রায়ই এমন কাজ দর্শনার্থীরা করে যেটা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে?

পনেরো শতকের দিকে খানজাহান আলী সুন্দরবনের আশেপাশের এলাকায় খলিফাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার আমলেই তুঘলকী ও জৌনপুরী স্থাপত্যকলার মিশেলে নির্মাণ করা হয় এই মসজিদ। মসজিদের দেয়ালগুলো অনেক পুরু। তিন ফুটের বেশি হবে (চোখের আন্দাজে বলছি, ফিতা দিয়ে মেপে দেখিনি)। নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ হলেও মসজিদের গম্বুজ কিন্তু ষাটটা নয় ৮১টা। পণ্ডিতরা মনে করেন, গম্বুজ ৮১ টা হলেও মসজিদে ৬০টি পাথরের কলাম বা স্তম্ভের উপর গম্বুজগুলো নির্মিত হয়েছে বলে নামটা হয়ে গেছে ষাট গম্বুজ মসজিদ। বিজ্ঞজনরা আরও মনে করেন, এই মসজিদটা মূলত তৈরি হয়েছিল খলিফাবাদ রাজ্যের দরবার হিসেবে, সাথে সাথে নামাযও হত। পরে রাজকারবার বন্ধ হয়ে গেছে কালের বিবর্তনে, কিন্তু নামায এখনও চলছে। দর্শনার্থী হিসেবে মসজিদে ঢুকতে টিকেট করতে হয়, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার জন্য মুসল্লিদের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে। 

মসজিদ প্রাঙ্গনে হাটার সময় কানে পড়ল, মসজিদের দারোয়ান গোছের কেউ একজন অাঠারো বিশ বছরের ছেলেকে বলছেন, “সেই যোহরের নামাযের সময় ঢুইকা এখনও ঘুরতাছেন, যান টিকেট নিয়া আসেন!”

বিভিন্ন সময় ষাট গম্বুজ মসজিদের ছবি দেখে খুব ভালো ধারণা হয়ে গিয়েছিল যে বাইরের দিকটা দেখতে কেমন হবে। কিন্তু মসজিদের ভেতরটাও যে এত অসাধারণ সেটা আমার কল্পনাতেও আসেনি। মসজিদের ভেতরে এত এত সাজানো সুবিন্যস্ত কলাম বা স্তম্ভ অন্য কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।সিরাজগঞ্জ জেলার শাহাজাদপুর উপজেলায় যে পুরাতন শাহী মসজিদ আছে সেটার ভেতরেও অনেক অনেক কলাম বা স্তম্ভ আছে, কিন্তু এত নয়। ইট বিছানো মেঝে শত বছরের ব্যবহার আর যত্নে টাইলসের মত ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। আর ঐতিহাসিক মূল্যের বিচারে এর দাম আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে দামী মার্বেল পাথরের টাইলসের চেয়েও অনেক বেশি। পাঁচ শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা সেই পাঁচ শতাব্দী আগেও বহু সময় নিয়ে বহু খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল, ইটসুরকির ফিনিশিং, কলামের কিনারাগুলো দেখলে শত বছরের পুরোনো যত্নের ছাপ খুব স্পষ্টভাবেই অনুভব করা যায়। মসজিদের পাথরগুলো আনা হয়েছিল সুদূর রাজমহল থেকে।

মসজিদের পাশেই বিখ্যাত ঘোড়াদীঘি। কথিত আছে, এই দীঘি খননের পর পানি আসছিল না। তখন খানজাহান আলী ঘোড়া নিয়ে নতুন খনন করা দীঘিতে নেমে চক্কর দেন। তারপর দীঘিতে পানি আসে। সেই থেকে এই দীঘির নাম হয়েছে ঘোড়াদীঘি। দিনাজপুরের রামসাগর নিয়েও এমন একথা উপকথা প্রচলিত আছে। প্রজাদের পানির সমস্যা সমাধানের জন্য রাজা প্রাণনাথ বিরাট দীঘি খনন করলেন। কথাপ্রসঙ্গে বলে রাখি, রামসাগর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দীঘি। কিন্তু নদীতে আর পানি ওঠে না। রাজা স্বপ্নে দেখলেন, ছেলে রামনাথকে দীঘিতে বিসর্জন দিলে, দীঘিতে পানি উঠবে। যুবরাজ রামনাথ দীঘিতে নামলেন, চারপাশ থেকে পানি উঠে দীঘি ভরে গেল। দীঘির নাম হল, রামসাগর। অন্য আরেক উপকথায় রাজা রামনাথই স্বপ্নে দেখেছিলেন, পরে দীঘিতে নেমে প্রজাদের কল্যাণে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন।

দিনাজপুর আর বাগেরহাট, দেশের দুই বিপরীত প্রান্তের দুই জেলা। কিন্তু তাদের উপকথার মধ্যে কত মিল! ব্যাপারটা মজার। অবশ্য উপকথার মিল তো পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুটি আলাদা সভ্যতার মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায়। সেই বিচারে দিনাজপুর আর বাগেরহাটের দূরত্ব অনেক কম।

যাইহোক, এরপর কোনো একদিন আবার ষাটগম্বুজ মসজিদে যেতে চাই। কয়েক ওয়াক্ত নামায এখানের জামাতে পড়তে চাই। কোনো তাড়া ছাড়া মসজিদের ভেতরে বাইরে ঘুরতে চাই। আর এই অসাধারণ স্থাপনা তৈরি করার সক্ষমতা মানুষকে দিয়েছেন বলে সৃষ্টিকর্তা আর তার সৃষ্টি নিয়ে মুগ্ধ হতে চাই।

There’s a video on this topic as well, please find the video here on youtube.

Author: Moheul I Mithu

মহিউল ইসলাম মিঠু কৌতুহলী মানুষ। জানতে ভালোবাসেন। এজন্যই সম্ভবত খুব অল্প বয়সেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পড়ার অভ্যাসটাই হয়তো ধীরে ধীরে লেখার দিকে ধাবিত করেছিল। তার পাঠকপ্রিয় অনুবাদ গুলোর মধ্যে রয়েছে: দি হবিট, দি লর্ড অফ দ্য রিংস, পার্সি জ্যাকসন, হার্ড চয়েসেজ, দি আইস ড্রাগন, লিজিয়ন, প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে, দি আইভরি চাইল্ড ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রথমসারির জাতীয় পত্রিকা, সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটের জন্য লিখেছেন বিভিন্ন সময়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন কিশোর-ম্যাগাজিন ‘আজবদেশ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। বিশ্বখ্যাত ২০টির বেশি বই অনুবাদ করে বিভিন্ন স্তরের পাঠকের আস্থা অর্জন করেছেন, জিতে নিয়েছেন ভালোবাসা। তার অনুদিত কিছু বই বিভিন্ন সময় জাতীয় বেস্ট-সেলারের তালিকাগুলোতে ছিল। (লিখেছেন: লে: কর্নেল রাশেদুজ্জামান)

Share This Post On

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share via
Copy link
Powered by Social Snap